;

কুতুবদিয়া বাতিঘর

প্রাকৃতিক নিসর্গের কক্সবাজার জেলাটি শুধু এর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের জন্যই বিখ্যাত নয়, এখানে রয়েছে দারুণ সৌন্দর্যের কুতুবদিয়া দ্বীপ। এই দ্বীপটিতে দেখার মত অনেক কিছুই রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম একটি আকর্ষণীয় স্থান হল বাতিঘর বা লাইট হাউজ। ঐতিহাসিক এই বাতিঘরটি পর্যটকদের জন্য দারুণ আকর্ষণের একটি জায়গা। কুতুবদিয়া ভ্রমণে গেলে অবশ্যই দেখতে ভুলবেন না প্রাচীন এই বাতিঘরটি। আসুন তাহলে জেনে নেয়া যাক এই বাতিঘরের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু তথ্য।

কুতুবদিয়ায় বড়ঘোপ বাজার থেকে সমুদ্র সৈকতের উত্তরদিকে এই বাতিঘরের অবস্থান। মোবাইল টাওয়ারের মত দেখতে বাতিঘরটি বানানো হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। সেটি সাগরে ডুবে যাওয়ার পর নতুন করে বানানো হয়েছে আরেকটি বাতিঘর। প্রাচীন বাতিঘরের রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস।

সেকালে সামুদ্রিক জাহাজে উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ছিল না, অভিজ্ঞ নাবিকরা প্রাচীন প্রচলিত পদ্ধতিতে সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিতেন। ১৮২২ সালে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস উপকূল-ভাগ বিধ্বস্ত করে দেয়। প্লাবনের ফলে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় সমুদ্র-বক্ষে পলি জমে সৃষ্টি হয় অনেক চর। বিস্তীর্ণ এলাকায় নতুন নতুন চর জেগে ওঠার ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে দেশি-বিদেশি জাহাজ চলাচলে সমস্যা দেখা দেয়। নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচলের স্বার্থে ব্রিটিশ সরকার বাতিঘর স্থাপনের জন্য জরিপ কাজ পরিচালনা করে এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে তিন দিকে বঙ্গোপসাগর পরিবেষ্টিত কুতুবদিয়ায় একটি সুউচ্চ বাতিঘর স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়। বঙ্গোপসাগরে চলাচলরত জাহাজকে সংকেত দেখানোর জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ও সামুদ্রিক এলাকায় বিভিন্ন সময় সেন্ট মার্টিন, কক্সবাজার, নরম্যান্স পয়েন্ট, পতেঙ্গা ও কুতুবদিয়ায় বাতিঘর স্থাপন করা হয়।

কুতুবদিয়া বাতিঘর

এসব বাতিঘরের বিচ্ছুরিত আলো ২৫ থেকে ৩৫ কিলোমিটার গভীর সমুদ্র থেকে দেখা যায়। সবচেয়ে প্রাচীন বাতিঘরটি স্থাপিত হয় এই কুতুবদিয়ায়। পাথরের ভিতের ওপর নির্মিত এই বাতিঘরটির উচ্চতা ছিল প্রায় ৪০ মিটার। এর ছয়টি কামরায় পাটাতন ও সিঁড়ি ছিল কাঠের। সর্বোচ্চ কামরায় আট ফিতার ল্যাম্প বসানো হয়েছিল। ল্যাম্পের জ্বালানি ছিল নারকেল তেল। ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন হেয়ারের তত্ত্বাবধানে ও ইঞ্জিনিয়ার জে এইচ টুগুডের নির্দেশনায় কুতুবদিয়ার বাতিঘরটি নির্মিত হয়। দক্ষিণ ধুরং ইউনিয়নের আলী ফকির ভেইলে পশ্চিম সমুদ্র উপকূলে নির্মিত এ বাতিঘর ১৮৯৭ সালের প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়; সমগ্র বাতিঘর নড়বড়ে হয়ে যায়। ১৯৬০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে স্থায়ী ভাঙনে বিলীন হওয়ার আগপর্যন্ত এ বাতিঘর বিরামহীন আলো দেখিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিকদের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূর থেকে দিকনির্দেশনা দিত।

পুরনো সেই বাতিঘর সমুদ্রে বিলীন হয়েছে বহু আগে। তবে এখনো ভাটার সময় সেই বাতিঘরের ধ্বংসাবশেষ কখনো কখনো জেগে উঠতে দেখা যায়। বাতিঘর এলাকায় পরে যে নতুন বাতিঘর তৈরি করা হয়েছিল, সেটিই এখন নাবিকদের পথ দেখায়। এই বাতিঘরটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি জায়গা। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটকরা এই বাতিঘরটি দেখতে আসেন। অতীত ইতিহাসের সাথে জড়ানো এই বাতিঘরটি আলোর দিশারী হয়ে আজো জেগে আছে সমুদ্রের বুকে।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে কক্সবাজার গামী বিভিন্ন এসি ও নন-এসি বাস সার্ভিস রয়েছে। এদের মধ্যে সৌদিয়া, এস আলম এর মার্সিডিজ বেঞ্জ, গ্রিন লাইন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, সোহাগ পরিবহন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৯০০ থেকে ২০০০ টাকা।

বাসে চড়ে আপনাকে নামতে হবে চট্টগ্রাম কক্সবাজারের পথে যাত্রা বিরতি বড়ইতলি মোড়ে। সেখান থেকে সিএনজি চালিত বেবিটেক্সিতে যেতে হবে মাগনামা ঘাট। জনপ্রতি ভাড়া ৩৫ টাকা। মাগনামা ঘাট থেকে কুতুবদিয়া চ্যানেল পার হতে হবে ইঞ্জিন নৌকা অথবা স্পিড বোটে।এই চ্যানেল পার হলেই পৌঁছে যাবেন কুতুবদিয়া। এরপর বড়ঘোপ বাজার যেতে হবে রিকশায়। ভাড়া লাগবে ২৫ থেকে ৩০ টাকা।

যেখানে থাকবেন:

কুতুবদিয়া দ্বীপে পর্যটকদের থাকার জন্য মানসম্মত একমাত্র আবাসন ব্যবস্থা হল হোটেল সমুদ্র বিলাস। সমুদ্র লাগোয়া এই হোটেলে বসে উপভোগ করা যায় সমুদ্রের সৌন্দর্য। হোটেলের দুই জনের নন এসি কক্ষ ভাড়া ৮শ’ টাকা, তিনজনের ১ হাজার এবং চার জনের কক্ষ ভাড়া ১ হাজার ২শ’ টাকা।

যোগাযোগ:

হোটেল সমুদ্র বিলাস, বড়ঘোপ বাজার, কুতুবদিয়া। ফোন: ০১৮১৯৬৪৭৩৫৫, ০১৭২২০৮৬৮৪৭।

ছবি – ইন্টারনেট

কন্ট্রিবিউটর – রুবাইদা আক্তার

Facebook Comments
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া দ্বীপের ঐতিহাসিক বাতিঘর