;


ইট পাথর আর কংক্রিটে পরিপূর্ণ আমাদের নগর জীবন। সুস্থভাবে অক্সিজেন নিয়ে নিঃশ্বাস ফেলার মতো জায়গা মেলাই ভার! আর তাই আমি ছুটির দিনগুলোতে বে0রিয়ে পরি কখনো জানা অথবা অজানা গন্তব্যের পানে।
আমার অফিসের সহকর্মী মনির ভাই এর সাথে কথা হচ্ছিল নতুন কোথায় যাওয়া যায় ঘুরতে। তিনি বললেন, ঢাকার অদূরে সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের ‘গোলাপ গ্রামে’ গিয়েছি কিনা। আমি বললাম, নাম শুনেছি কিন্তু যাওয়া হয় নাই। মনির ভাই বললেন, আমার বাড়ি থেকে গন্তব্য পানে যেতে খুব বেশি হলে পঁচিশ মিনিট লাগবে। চলে আসুন আসছে সপ্তাহে। ঘুরে আসবেন গোলাপ গ্রাম থেকে। আমি ভাবলাম প্রস্তাবটা মন্দ নয়। আর পরিচিত কেউ থাকলে গন্তব্য পানে যাওয়া আরো সহজ হয়। বললাম, ঠিক আছে আসছে সপ্তাহেই আমি আর আমার সহধর্মিণী হাজির হবো আপনার এলাকায়।
বারে বৃহস্পতিবার তাই অফিসে কাজের চাপ ও একটু বেশি তার মাঝে কাল নতুন গন্তব্যে ঘুরতে যাবো এই খুশিতে কাজ করার স্পৃহা দ্বিগুণ বেড়েছে। অফিস শেষ করে বাসায় এসে সানন্দাকে বললাম, কাল তোমাকে অন্য রকম এক জায়গায় ঘুরাতে নিয়ে যাবো। প্রত্যুত্তরে সানন্দা জানতে চাইলো কোথায় নিয়ে যাবে। আমি বললাম, এখন বলা যাবে না; কাল গেলে পরেই দেখতে পাবে।
রাতের পেট পূজা শেষ করে সময় নষ্ট না করে শুয়ে পড়লাম। পরের দিন সক্কালবেলা ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে নিলাম নতুন গন্তব্য পানে যাবো বলে। সূর্যদেবের প্রখরতা বাড়ার আগেই বেড়িয়ে পড়লাম আমরা। তিন চাকার মানব গাড়ি করে আমরা পৌঁছালাম গুলিস্থানে। রিকশা থেকে নামতেই একজন বললেন, এই বাস একটু পরেই গন্তব্য পানে যাত্রা শুরু করবে তাই এই বাসে উঠতে। আমি ভাবলাম আগে আগে পৌঁছাতে পারলেই ভালো হয় তাহলে ভালো ভাবে ঘুরে দেখে আসতে পারবো। সেখান থেকে উঠে পড়লাম বাসে।
বেশ কিছু সময় পেরিয়ে গেলো গাড়ি তো ছাড়ার নাম নেই। এদিকে একটু পর পর মানুষ ডেকে ডেকে ওঠাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আমাদের বাস ছাড়লো গন্তব্য পানে প্রায় একঘণ্টা বিলম্ব করে। এদিকে মনির ভাইয়ের ফোন; কোথায় ভাই আপনারা? আমি বললাম, বাস ছেড়েছে মাত্র, আসছি। আমরা চলছি মহাসড়ক পেরিয়ে। মিরপুর, ধানমন্ডি, ফুলবাড়ি হয়ে চলছে এগিয়ে। প্রায় পনে এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা এসে পৌঁছালাম সাভার বাস স্ট্যান্ডে। সেখানে আগের থেকেই অপেক্ষা করছিলেন মনির ভাই। দেখা হতেই মনির ভাই বললেন, আগে চলেন আমার বাসার দিকে যাই সেখানে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে গন্তব্য পানে বেরিয়ে যাবো। আমি বললাম, না আগে ঘুরে আসি পরে আপনার বাসায় যাবো। তাই কাল বিলম্ব না করে আমরা উঠে পড়লাম তিন চাকার ইঞ্জিন গাড়িতে। ছুটে চলছে আমাদের তিন চাকার যান্ত্রিক বহর।
ভাঙা সড়কে দোল খেতে খেতে কিছুটা পথ আগাতেই নৈসর্গিক সব দৃশ্যে চোখ আটকাল। সত্যিই অসাধারণ, ঢাকার পাশেই এমন মায়াবী প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হবে না। সোঁদা মাটির গন্ধ নাকে পেতে পেতেই চোখে ধরা পরল লাল গোলাপের বিশাল বাগান। সানন্দা দেখে তো বেজায় খুশি। মনির ভাই বললেন, আরেকটু সামনে গিয়ে নামি, তখন শেষ মাথা থেকে ঘুরে ঘুরে দেখে আসতে পারবো। গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে গেছে আঁকাবাঁকা সরু পথ। পথের ধার ঘেঁষে অসংখ্য গোলাপের বাগান।
যত দূর চোখ যায়, শুধু লাল গোলাপের সমারোহ। মাঝে মাঝে কিছু সাদা গোলাপ, গ্লাডিওলাস, জারবেরার বাগানও চোখে পড়ে। সূর্যদেবের রক্তিম আভার সাথে লাল টকটকে গোলাপ মাথা উঁচিয়ে থাকে। দুপুরের পর থেকেই চাষিরা বাগানে নেমে যান গোলাপ তুলতে। গাছের সারির এক পাশ থেকে ফুল তোলা শুরু করে শেষ পর্যন্ত মুঠো ভরে ফুল তোলেন। চাষিদের ফুল তোলার দৃশ্যও বেশ উপভোগ্য।


মনির ভাই বললেন, বাণিজ্যিকভাবে এখানে প্রথম গোলাপ চাষ শুরু হয় ১৯৯০ সালে। কয়েকজন যুবক এ গোলাপ চাষ শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ভাল ফলন ও ভাল মুনাফা হওয়ায় এখন সাদুল্লাহপুর, শ্যামপুর, মোস্তাপাড়া গ্রামের মানুষ গোলাপ চাষ করে অনেকেই স্বনির্ভর। ‘বর্তমানে গোলাপ পুরো ইউনিয়নেই চাষাবাদ হচ্ছে। সাদুল্লাহপুর গ্রামের মানুষ স্বল্প সময়ে বেশি মুনাফার আশায় মূল পেশা পরিবর্তন করেছে। তারা কৃষিকাজ ছেড়ে এখন সবাই গোলাপ চাষে ব্যস্ত। সাদুল্লাহপুর গ্রাম সংলগ্ন শ্যামপুর, মোস্তাপাড়া রানী পাড়া গ্রামের চিত্র একই। আমরা পদব্রজে এগিয়ে চলছি গোলাপ বাগানের ভেতরে ছবি ও তুললাম।
এবার গেলাম গোলাপের হাঁটে। বছরের বারো মাসই গোলাপ চাষ হয়ে থাকে। ভর সন্ধ্যায় ফুল বিক্রির বাজার বসে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা আসেন গোলাপ কিনতে।এখন সন্ধ্যা হতে মেলা বাকি তার পরেও হাটে আসতে শুরু করেছে ফুল। আমি এক আঁটি ফুল কিনি সানন্দার জন্য, ফুল পেয়ে সানন্দা মহা খুশি। এবার গেলাম মনির ভাইয়ের বাসায় সেখানে পেট পূজা শেষ করে ফিরে চললাম শহর পানে।


যাবেন কি ভাবে?
ঢাকা থেকে উত্তরা থার্ড ফেস, মিরপুর বেড়িবাঁধ ও গাবতলী হয়ে সাভার উপজেলার বিরুলীয়া ইউনিয়নের উত্তর শ্যামপুর গ্রামে সরাসরি নিজস্ব/ভাড়া গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে। এছাড়া সাভার বাজার স্ট্যান্ড থেকে বাসে বা লেগুনাতে যাওয়া যাবে। সে ক্ষেত্রে কয়েকবার যানবাহন বদল করতে হবে। আর উত্তরা বা বেড়িবাঁধ দিয়েও নিজস্ব গাড়ি ছাড়া যেতে চাইলে কয়েক দফা গাড়ি বদল করে বিরুলীয়া ব্রিজ দিয়ে চলে যেতে পারেন।
লেখা: সুমন্ত গুপ্ত

Facebook Comments
গোলাপ গ্রাম: ঢাকার পাশেই এমন মায়াবী প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হবে না