;

ক্লান্তিহীন ঘুরে বেড়ানোর জন্য সব চাইতে মোক্ষম সময় হল মৌসুম শীত। এক চক্করেই নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ানো যায়। তাই শীত মৌসুমটাকেই ভ্রমণপ্রিয় মানুষগুলো বেশী প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আবার অনেকেই আছেন সময় সুযোগের অভাবে দূরে কোথাও যেতে পারেন না। কিন্তু মন পড়ে থাকে প্রকৃতির পানে। হাঁসফাঁস করে মন প্রকৃতির সান্নিধ্য পাবার। তাঁদের জন্যই ধারে কাছে কোথায় কোথায় ঘুরতে যাওয়া যাবে সেই সব ভ্রমণ গল্পের অবতারনা।
সরষে ক্ষেত:
শীতকাল অথচ দিগন্ত জোড়া সরষে ফুল দেখা হবে না তাই কি হয়। দেখা হবে না মায়াবী সবুজে ঘেরা কোন নদী থেকে ধর্মজাল পাতা জেলের মাছ ধরা কিংবা মাথার উপর পরিযায়ী পাখির দল বেঁধে উঁড়াউড়ি। নাহ কিছুতেই তা সম্ভব নয়। দেখতেই হবে। তাহলে আর দেরী না করে চলে যান ঢাকার পাশেই সাভারের বংশী নদীর ধারে। সরষে ফুল, মাছ ধরা আর পাখির খেলা তিনটিই এক সাথে দেখা যাবে। সেখানে গেলে যতদূর চোখ যাবে শুধু হলদে রাঙ্গানো জমিনের দেখা পাবেন।
সরিষা ফুলের ঘ্রাণে মন করবে আনচান। শান্ত বংশীর রূপে হবেন মাতাল। পুরো পৌষ আর মাঘের অর্ধেক মাস জুড়ে আবহ বাংলার অধিকাংশ জেলার মাঠ এরকম হলুদ বর্ণ ধারণ করে। প্রকৃতির এই সময়টা এখন হলদে রঙের সাজানো রাজ্য। তবে এ অঞ্চলটা যেন একটু অন্যরকম আবেশের, ভিন্ন রকম সৌন্দর্যের। এখানকার জমি যেন সরষের জন্যই সৃষ্টি। সরিষা মূলত রবী শষ্য। সরিষা তেল এবং শাকও বেশ মজাদার খাবার। আপনিও চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আশপাশের কোন সরিষা ক্ষেত হতে। যেতে পারেন ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার ফোর্ড নগরের রূপনগর গ্রামে।
সাভার উপজেলার নামা বাজার এলাকা দিয়ে বংশী নদীর উপর নব নির্মিত “সাভার ফোর্ড নগর” সেতু ধরে চলে যাই সুনসান নিরিবিলি পিচ ঢালা সরু পথে। পড়ন্ত বিকালে পাখির কুহু কুহু ডাক,নানান প্রকারের সবজি ক্ষেত,জমির পর জমিতে সরষে ফুলের ঘ্রাণ শুকতে শুকতে, গুটি গুটি পা’য়ে হেঁটে চলে যাই সরষে ক্ষেতের আইল ধরে দূর অনেক দূর। দেখা হয় কৃত্রিম মধু সংগ্রহের দৃশ্য। জানা হয় একটি রাণী মৌমাছি,প্রায় পঞ্চাশ হাজার মৌমাছির নেত্রীত্ব দিয়ে থাকে। সরষে ফুলের মধু মানব দেহের জন্যও বেশ উপকারী। পুরো একটা বিকেল নজর কাড়া সরষে ফুলে ঘেরা, রূপনগরের নিরিবিলি গ্রামে ঘুরে বেড়াই। অপরুপ সূর্যাস্ত শেষে গরম গরম ডালপুরি আর গাভীর দুধের চা-আহ্ সব মিলিয়ে এক অসাধরণ সময় পার হবে। বংশী নদীর সৌন্দর্যও কম যায় না। চাইলেই ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে বংশী’র বুকে ভেসে বেড়াতে পারেন। সব মিলিয়ে মাত্র কয়েক ঘন্টার বেড়ানো হতে পারে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। জীবন-মন রাঙ্গাতে আপনিও চলে যান রবী শষ্যের সরষে ক্ষেতে। ইচ্ছে করলে বাড়ীর সবাইকে নিয়েও ঘুরে আসতে পারেন।


গোলাপের রাজ্য:
ঢাকার অদূরে সাভার উপজেলার বিরুলীয়া ইউনিয়নের উত্তর শ্যামপুর গ্রামের পথে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র বন্ধুরা গাড়ী হাকাই। চালকের আসনে আমি নিজেই। চিপা গলী পেরিয়ে মহা সড়কে দূর পাল্লার যানবাহনকে ছাড়িয়ে আমি যাই এগিয়ে। মনে শুধু ভয় একটাই চাকা না হয় পাংচার।এই বিষয়টাকে আমি মহা ভয় পাই। গাড়ী চলছে- সাভার বাজার পিছনে ফেলে,মহা সড়ক থেকে ডানে মোড় নিয়ে সি.এন.বি সড়কে ছুটছি। এইবার সরু পথে ফিটনেস বিহীন গাড়ী থেকেও মহা ভয়ঙ্কর অটো রিক্সার জ্বালায় কিছুটা ভীতু আমি। যদি গাড়ীতে আাচড় লাগে তাহলেতো আব্বার ধমকি কত প্রকার তা আরেকবার জানা হয়ে যাবে। আক্রাইনের মোড় হতে শুরু হলো আরো বেদনা বিধুর রাস্তা,এসেই যখন পড়েছি তখন আর কী করা। দেশের বড় বড় নাম করা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এখানে অথচ সড়কের কী বেহাল দশা ! একেই বলে বাতির নীচে অন্ধকার।
তবে দে-ছুটের বন্ধুরা ঠিকই অন্ধকারের বিপরীতে আলোর ঝলক খুঁজে নিতে পারে। এবারো তাই হলো। ভাঙ্গা সড়কে দোল খেতে খেতে কিছুটা পথ আগাতেই নৈসর্গিক সব দৃশ্যে চোখ আটকালো।সত্যিই অসাধারণ,ঢাকার পাশেই এমন মায়াবী প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হবে না। সোদা মাটির গন্ধ নাকে পেতে পেতেই চোখে ধরা পরল লাল গোলাপের বিশাল বাগান। গাড়ী পার্ক করেই ছুটি বাগানের ভিতর। ইয়া খোদা! এই দেখি বিশাল লাল গোলাপের সমুদ্র তার মাঝে আমরা অতিকায় এক ক্ষুদ্র প্রাণী। যতই এগিয়ে যাই ততোই যেন অপার্থীব ভালোলাগা ভর করে মনে। বাগানের পর বাগান। মাথায় নেশা চেপে বসে,কিসের গাড়ী আর কিসের বাড়ী।সবই আজ ঠুনকো।গাড়ীর চিন্তা বাদ দিয়েই ভিতর থেকে ভিতরে ঢুকতে থাকি।
যতই আগাতে থাকি ততোই যেন গোলাপ বাগানের লোক গুলো আপন হতে থাকে। প্রথম বাগানে যে আটির দাম ছিল ৪০০ টাকা এখন তা পারলে এমনিতেই দিয়ে দেয়। আগে থেকেই ধারণা পেয়েছিলাম বিরুলীয়া এলাকার লোকজন একটু উগ্র যার কারণে সাভার বাসীরাই তাদেরকে টেঙ্গুইরা বলে থাকেন কিন্তু আমরা পেয়েছি তার উল্টো।কথায় আছে না নিজে ভালোতো জগৎ ভালো। হাটঁতে হাটঁতে এবার পেয়ে যাই এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সব গাছকে ছাড়িয়ে মাথা উচুঁ করে থাকা তাল গাছের সারি।জসিমের চোখে ধরা পড়ে রসের হাড়ি। বন্ধু রস খাব। আবার জিগায়! চল যাই গাছের তলায়। দুঃখের বিষয় তালের রসের স্বাদ পেতে হলে আবারো আসতে হবে সাত সকালে। কি আর করা এক সফরেতো আর সব মিলে না।ওরকম আশা করাটাও ঠিক না। গাছীর সেল নাম্বার নিয়ে আবারো আগাই। এবার চোখ পরে ঝাকায় ঝুলে থাকা লাউ আর মাটিতে শুয়ে থাকা মিষ্টি কুমড়ার প্রতি।
দেখা হয় স্থানীয় বাসিন্দা বয়োবৃদ্ধ জনাব আব্দুল খালেকের সাথে। তিনি জানালেন এই টেঙ্গর শ্যামপুর গ্রাম হতেই গত বিশবছর পূর্বে প্রথম গোলাপ চাষ শুরু করেন গোলাম রসুল। তাঁর বাগান করা দেখেই- ধীরে ধীরে গ্রামের অন্যরাও অনুপ্রাণিত হয়ে ফুল চাষে এগিয়ে আসেন। শ্যামপুর গ্রামের প্রায় ষাঁট পাকি [১৫,৬০ শতাংশ] জমির উপর বর্তমানে গোলাপ চাষ হয়ে আসছে। গোলাপ ফুল চাষ এখন শুধু এই গ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই,বিরুলীয়া ইউনিয়নের অন্যান্য গ্রামেও প্রসারিত হয়েছে। বছরের বারো মাসই গোলাপ চাষ হয়ে থাকে। ভর সন্ধ্যায় ফুল বিক্রির বাজার মিলে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা আসেন গোলাপ কিনতে। দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের জন্য ফুল চাষীরা গড়ে তুলেছেন নিরাপত্তা বলয়। মাগরিবের নামাজ শেষে সবুজের বারোভাজা খেয়ে ফিরতি পথ ধরি। ইচ্ছে হলে একটা বিকেল কাটিয়ে আসতে পারেন পুরো পরিবার কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে।


সাইট্টা গ্রাম:
একটি প্রাচীনতম বট বৃক্ষ যেন শত শত বছরের জীবন্ত কালের সাক্ষী। একটি বট গাছের জীবদ্দশায় কত রাজা আর তাঁর রাজ্যের ইতিহাস গেঁথে রয়েছে এর কোন ইয়াত্তা নেই। পুরনো কোন স্থাপনা দেখলে যেমন মানুষ নষ্টালজিয়ায় ভোগে ঠিক ওর চাইতেও বেশী মানুষ স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন যদি কোন শতবর্ষী গাছের ছায়ায় যান।
ভ্রমণ সংগঠন “দে-ছুট” তাদের সংগঠন হতে বিভিন্ন বিষয়ের উপর ২০১৭ সালের সেরাদের সম্মানে ভ্রমণ আয়োজন করা হয়। স্থান ছিল ঢাকার পাশেই ধামরাই উপজেলার সাইট্টা গ্রাম। ব্যক্তিগত গাড়ীতেই সবাই যেযার মত ছুটছি। দিনটি ছিল শুক্রবার। তারপরেও যানজটের মহামারী ছাড়িয়ে সকাল ৯টার বদলে বেলা প্রায় ১১ টায় সাভার বাজার এলাকায় সবাই একত্রিত হই। জসিমের প্রচেষ্টায় খেজুররস পান শেষে গাড়ী হাকাই ধামরাইর পথে। নবীনগর পর্যন্ত ঠেলে ঠুলে গাড়ী চলে। এর পর একটানে ঢুলিভিটা হয়ে ধানঁতারা। মাঝে জুম্মা নামাজের বিরতি। ধানতাঁরা থেকে বামে মোড় নিয়ে গাড়ী যখন ছুটে সাইট্টার পথে তখন মনে হয় এ যেন এক প্রশান্তির পথ। বাংলার সেই চিরচেনা সুনসান নিরিবিলি গাঁয়ের পথ। সবুজ প্রান্তর-গাছের ছাঁয়া, পাখির কলতান শুনতে শুনতে এগিয়ে যাই সাইট্টা। দূর থেকে গাড়ীর জানালা দিয়ে যখন বটগাছ চোখে পড়ে তখন কিছুটা নিরাশ হয়ে পড়ি। কেউ একজন মন্তব্যই করে ফেলল,এত দেখছি গাব গাছের পাতার মত। মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল।
পিচঢালা পথ ছেড়ে গাড়ি ঢুকে মেঠো পথে। থামে গিয়ে একেবারে বট বৃক্ষের ছাঁয়াতলে। আনন্দে মন নেচে উঠে। ওয়াও! চোখ ঠেকে কপালে। অবাক বিস্ময়ে শুধু তাকিয়ে রই। একি আসলেই বট বৃক্ষ নাকি ভিন্ন কিছু। নানান জায়গায় ঘুরতে গিয়ে জীবনে অনেক অনেক বট গাছের ছাঁয়ায় বসার সুযোগ এসেছে কিন্তু এরকমত আর কোন বট গাছ আমার চোখে পড়ে নাই। আশ্চর্য সুন্দর সাইট্টা বটগাছের দার প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজেকে বেশ সুখি সুখি মনে হল। ভালো করে পরখ করতে থাকি। গাছের উপর থেকে বটের ঝুরি মানে শাখামূল ঝুলে, মাটির সাথে মিশে গিয়ে এমন এক অদ্ভুদ রুপ ধারণ করেছে যার বর্ণনা দিয়ে পাঠকদের বুঝানোর মত সাধ্য নেই আমার। যা শুধু স্বচক্ষেই দেখে অনুভব করা যাবে। এরকম একটি বট গাছের সান্নিধ্যে সবাই বেশ আনন্দিত। ছবির ছৈয়ালরাও বেশ ব্যস্ত। ক্যামেরার শার্টারে শুধু ক্লীক ক্লীক শব্দ। উচ্ছ্বাসিত না হয়ে উপায় আছে!
একটি বট গাছ – একটি জীবন্ত ইতিহাস। সেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইল, আজকে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র দামালেরাও। গাছের আদৌপান্ত জানতে এবার স্থানীয়দের খোঁজে নামি। দু-একজনের সঙ্গে ভাব জমাই। কিন্তু তথ্য সুত্র নির্ভরযোগ্য মনে হয় না। এদিকে পেটেও টান পড়েছে। ইচ্ছে ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বট তলায় ভাত-ভর্তা খাব,কিন্তু সময়ের আবর্তনে তা বিবর্ণ হয়ে সাইট্টা বট গাছের তলায় এসে ঠেকেছে। সব দোষ যানজটের। শহর-মহাসড়কের জ্যাম বর্তমানে ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য মহাযন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। সময় মিলিয়ে এখন আর কিছুই করা যায় না। এদিকে এই গ্রামের ধারে কাছে কোন খাবার হোটেলও নেই। ভাগ্য ভালো গাড়িতে হাড়ি-পাতিল ছিল। করিৎকর্মা ফারুক বাইকে চড়ে স্থানীয় বাজার থেকে চাউল-ডাইল-ডিম কিনে আনে। গ্রাম্য চা দোকানি সন্তুষের সহযোগিতায় শুরু হয় রান্নার মহা যজ্ঞ। সে সুযোগে ঘুরে বেড়াই পুরো গ্রাম। ঘুরতে আর জানতে গিয়ে চোখে ধরা দেয় সাইট্টা গ্রামের নানান রুপ। জমির পর জমি লেবুবাগান। থোকায় থোকায় ধরে আছে নানান জাতের লেবু। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে হাটু জলের ছোট নদী। সেই নদীতেই জেলে ধরে মাছ। গাছের ডালে ডালে নানান রঙের পাখি। জনমানবের কোলাহল নেই। পাখিরা নিশ্চিন্ত মনে গেয়ে যায় গান। যেন সাইট্টা গ্রামটি ওদের জন্য অভায়শ্রম।
ভর সন্ধ্যায় রান্না শেষ। মাগরিব নামাজ আদায় শেষে, খাবার জোটে ধোঁয়া তোলা খিচুরি আর ডিম ভূনা।আহ্ কি মজার স্বাদ। খেতে খেতেই পরিচয় হয় জনি দাস নামক এক তরুণের সঙ্গে। তার সাথে আলাপচারিতায় জানা গেল বেশ কিছু তথ্য। সাইট্টা গ্রামটি ধামরাই উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নের অন্তভূক্ত। ষাটটি পরিবার নিয়ে প্রথম এই গ্রামে বসতি শুরু। সেই থেকেই এই গ্রামের নাম ষাটটি থেকে সাইট্টা হয়েছে। গ্রামে মানুষের সংখ্যা প্রায় চারশজন। শতকরা নিরান্নব্বই শতাংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। শিক্ষার হার প্রায় ৯৫ শতাংশ। পেশায় অধিকাংশই সরকারী ও বেসরকারী চাকুরে। ধারণা করা যায় গ্রামবাসীগণ মানসিকতায় বন্ধুবৎসল।বট গাছটি সম্পর্কে জানালেন, এটির বয়স আনুমানিক প্রায় পাঁচশ বছর। যদিও সুনির্দিষ্ট করে কেউ জানাতে পারেন নাই তবুও অন্তত চারশ বছরের কম নয়। বট গাছটি প্রায় দুই একর জায়গা জুড়ে বিসৃত। বটগাছটিকে ঘিরে ভুতুড়ে কিছু কল্পকাহিনী লোকমুখে চালু রয়েছে। ফলে এর ডালপালা-ঝুরি না কাটা বা ছাটা হওয়ায় এখন এক বিশাল দৈত্তাকার রুপ ধারণ করেছে। গাছটির পাশেই একটি নাট মন্দির রয়েছে। সেখানে নিয়মিত পুজা-আর্চনা চলে। নির্ভরযোগ্য তথ্য দিয়ে ভদ্রলোক বিদায় নিলেন। নীরব নিস্তব্দ গ্রাম্য পরিবেশে শুরু হল দ্বিতীয় পর্ব বার-বি-কিউ। কয়লার আগুনে গোস্ত ঝলসানোর সুযোগে, আমাদের কেউ কেউ কুয়াশায় ডুবা ঘুটঘুটে অন্ধকারে, বট গাছের তলায় গিয়ে সেইরকম একটা ফ্লিংস অনুভব করে ফিরে এসে রঙ লাগিয়ে ফিরিস্তি দিল। রাত নয়টায় সব আয়োজনের ইতি টানি। অবশেষে শিয়াল পন্ডিতদের হুক্কাহুয়া আওয়াজ আর তুষারের মত কুয়াশা ভেদ করে ঘরে ফেরার পথ ধরি।


রসের খোঁজে:
ঢাকার কাছেই রসুলপুর,খবর রাখে কে? দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ সংগঠনের দেশ চেনা আয়োজনের কর্ম সূচী হিসেবে এবার গিয়েছিলাম পাঁচ গাও ও রসুলপুর। পুরো গ্রাম জুড়ে সারি সারি খেজুর – তাল গাছের রয়েছে ছড়া ছড়ি। বৃহস্পতিবার সন্ধায় ছুটি নারায়ণগঞ্জের আড়াই হাজার উপজেলার পুরিন্দা বাজার অভিমুখি। গাড়ী থেকে নেমেই পেয়ে যাই,গরম গরম মিষ্টি, সাথে গরুর দুধের চা। কোনটা রেখে কোনটা খাই ,অবশেষে খাওয়া আর পান দুটোই চলে সমান তালে। ইতিমধ্যে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের সব বন্ধু এসে হাজির। ধুপধাপ কিছুক্ষণ সেল্ফি আর ফটো সেশন। শাহীন মামুর উচ্ছাসে মনে হয়,সে যেন বুড্ডার আড়ালে-উদ্দিপ্ত তরুণ। সি.এন.জি’তে চেপে,মুরগী ভরা হয়ে ছুটি রাজু খন্দকারের বাড়ী। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই পৌছে যাই পাচ বাড়িয়া ইউনিয়নের পাঁচ গাও গ্রামে। মায়াবি চাদের রোশনী যেন ভর করেছে, গ্রামের মাঠ-ঘাট আর নানান গাছ গাছালির উপরে। রাতের নিরবতায় ছেদ পড়ে আমাদের উচ্ছাসে। আসলে নগরের ঘিঞ্জি পরিবেশে বাস করা মানুষেরা একটু খোলা-মেলা,বিশেষ করে গ্রামে গেলে এমনিতেই আপ্লুত হয়ে পড়ে। সি,এন,জি ছেড়ে- গ্রামের পথ ধরে কিছু দূর হাটার পরেই থামি খন্দকার বাড়ীর ফটকে।আসার আগেই জেনেছি বাড়ীটি প্রায় পরিত্যক্ত।ভিতরে ঢুকতেই চোখ গিয়ে উঠে কপালে। খন্দকার বাড়ি বলে কথা। বিশাল উঠোন তার পাশেই সান বাধানো পুকুর,পুরোনো সব গাছ। মাথার ভিতর ভুত দেখার নেশা চেপে বসে। কিন্তু বুঝতে দেইনা সঙ্গীদের। এরই মধ্যে মাল্টীক্স ফারুক আর ইউশা শুরু করে দেয় মুরগী পোড়ার কাহিনী। ইয়া উচুঁ কদ বেল গাছের পাতার ফাক গলে আসা জোছনার আলো, সঙ্গে রাতুলের গিটারে সুরের মূর্ছণায় চলে বার বি কিউ। রাতের খাবার শেষে, শিয়াল দেখার বায়না তুলে- ছুটি ভুতের সন্ধাণে [বদ জীণ]। শুনতে অবাক শুনালেও কথা সত্য!
চার পাশ থেকে ভেসে আসে খেক শিয়ালের ডাক কিন্তু আমাদের মত পাতী হিয়ালদের [ বাউন্ডেলে ] ভয়ে খাটি শিয়ালের দল লাপাত্তা। পুরো গ্রাম প্রায় চষে বেড়াই। রাত তখন দুটো। ভূত -শেয়ালের দেখা না পেয়ে নিজেরাই কিছুক্ষণ ভুতের অভিনয় করে,ঘরের পথ ধরি। ঘুমের প্রস্তুতি। উঠতে হবে বিয়াইন [ ফযরের সময় ] রাতে,তাই বিছানায় শুয়ে খানিকটা সময় চোখ বুজে রই। আমার খুক্কুর খুক্কুর কাশির কর্কশ সুরে,অন্যদেরও ঘুম গিয়ে মাচায় চড়ে।এপাশ ওপাশ করতে করতেই ভোর পাচটা। বিছানা ছেড়ে অযু করে সোজা মসজিদে। জমাতে নামাজ আদায় করে ছুটি পাশবর্তি গ্রাম রসুলপুরে। কুয়াশা ভেদ করে সোদা মাটির গন্ধ শুকতে শুকতে সি এন জি পৌছে একেবারে খেজুর বাগানের প্রায় রসের হাড়ির সামনে। চলে রস পান আর ফটো সেশন। এখানে রয়েছে পচাশিটি খেজুর গাছ। গাছের ছায়ায় বিল,দিগন্ত জোড়া শষ্য ক্ষেত। চোখ জুড়ানো সরিষা ফুলের মাতাল করা ঘ্রাণ। পুরো পরিবেশটাই এক অন্যরকম ঘোর লাগা মায়ায় আচ্ছন্ন। ইচ্ছে মত রস পান আর গাছিদের সুখ-দুঃখর একাল সেকালের গল্প শুনে, ছুটি এবার গ্রাম দর্শনে। সবজি ক্ষেতের আইল ধরে-গ্রামের মেঠো পথ মাড়িয়ে ঘুরে বেড়াই মহানন্দে। দে-ছুটের পোলাপাইন্না পানা দেখে, গ্রামের যুবা-বৃদ্বরাও যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছিল কিছুক্ষনের জন্য। রসুলপুর গ্রাম বাসি কৃষি জমি আবাদের পাশাপাশি,তাঁতের কাপড়ও বুনে থাকে। ভয়েল,গামছা,পর্দা কাপড়ের গ্রে তৈরী করে থাকে। আমরা তাদের কারখানায় ঢুকে অভিজ্ঞতা নেওয়ার পাশাপশি,নিজেকে চিনতে শিখি। কত পরিশ্রমের পরেও তাদের ঠোঁটের কোনায় চিক চিক হাসি। চোখের চাহনিতে ফুটে উঠে,আতিথীয়তার বাণি। অথচ শহুরে মানুষ গুলো নিজেকে নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকার পরেও,শত তাশায় ভুগে। লাখো পতি থেকে কোটি পতি,কোটি পতি হতে অধিপতি তবুও যেন মিটে না চহিদার গ্লনি। গ্রামের মানুষ গুলোর রয়েছে দু খানা গাভী,গোটা কয়েক ব্লাক বেঙ্গল আর কিছু হাস-মুরগি,রাতে ঘুমানোর জন্য মাটি বা ছনের ঘর, তাতেই তাহারা বেজায় খুশি। ভ্রমণে যেখানেই যান না কেন দেখার পাশা পাশি শেখারও রয়েছে অনেক কিছু।


বেশ কিছু দোকান ঘর চোখে পড়তেই ,চা পানের জন্য নেই বিরতি। দোকানিকে জায়গার নাম জিজ্ঞাসা করতেই জানাল এটা নরসিংদি। শুনে বেশ মজা পাইলাম। সাত সকালেই এক জেলা থেকে আরেক জেলা। বাজারটা হল নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদির সিমান্তবর্তি। চলে চা পান আর মাস্তী । অতঃপর ফিটনেস বিহিন গাড়ীর চাইতেও ভয়ানক বাহন অটো’তে চড়ি,ছুটি সেই ভাল লাগার নেশা ধরা খন্দকার বাড়ী। সকালের নাশতায় প্রথমে গরম গরম ভাপা পিঠা পরে গরুর গোস্তের ঝোল দিয়ে পছন্দের তালিকায় নাম্বার ওয়ান চীতই পিঠা। আহ্ কি মাজা,স্বাদে অতুলনিয়,আয়োজনে আরাফাত। টাকার বিপরিতে পিঠা খেলেও,পরিশ্রম করে যারা তৈরী করেছেন তাদের প্রতি আন্তরিক সাধুবাদ। পিঠা পর্ব শেষে এবার গ্রামের পশ্চিম পাশটায় হাইকিং।ওমা একি! নগরায়নের বিষাক্ত থাবার আচড় দেখি, এখানেও পড়তে শুরু করেছে। তাহলে কি থাকবে না এই সবুজ প্রান্তর। অচিরেই কি হারিয়ে যাবে আমাদের গ্রাম বাংলার মেঠো পথ ? পূর্বাচলের বাতাস এখানেও ছুঁেয়ছে। গ্রাম আর গ্রাম থাকবে নারে ছৈয়াল। ভবিষ্যৎ প্রজম্ম যেন আর্কাইভে ছবি দেখে জানতে পারে,আমাদের দেশটা সবুজ প্রকৃতি দিয়ে ঘেরা ছিল কত সুন্দর। সেই আবেগ থেকেই মুজাহিদ তার ক্যামেরার সার্টার চাপে অসংখ্য বার। এবার জুম্মার প্রস্তুতি। নামাজ শেষে,দুপুরের আহার কালিজীরা চাউলের আঠালো খিচুরি সঙ্গে মুরগী গোস্তের ভূনা আর ডিমের ঝোল। চেটেপুটে খেয়ে,বিদায়ের করুণ সুরে,ভাল লাগার কিছু স্মৃতি মনে গেঁথে, পথ ধরি ঢাকার দিকে। বিদায় পাচগাঁও – বিদায় পুরিন্দা।
কিভাবে যাবেনঃ ঢাকার গুলিস্তান হতে বিভিন্ন পরিবহনের গাড়ী যায় মধাবদী ও পুরিন্দাবাজার।
ভাড়া জন প্রতি একশত টাকা। সব চাইতে সুবিধা হবে নিজস্ব / রেন্ট কার নিয়ে গেলে। সকালে গিয়ে সন্ধায়ও ফিরতে পারেন।
কত খরচ হবেঃ জন প্রতি হাজার বারোশ হলেই যথেষ্ট।
সরষে ফুল দেখতে কিভাবে যাবেনঃ ঢাকার বঙ্গবাজার,মতিঝিল,গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী এবং সদর ঘাট হতে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস রয়েছে সাভার বাজার স্ট্যান্ড যাওয়ার জন্য। সেখান থেকে অটো বা রিক্সায় ফোর্ড নগর।
ভাড়াঃ ঢাকা হতে সাভার জন প্রতি ৩৫ টাকা হতে ৭০ টাকা।সাভার স্ট্যান্ড হতে নামা বাজার পর্যন্ত ৫ টাকা হতে ২০ টাকা অথবা সরাসরি চলে যান বড় কুশিয়ারা। ভাড়া ৫০ টাকা।
তথ্যঃ সরষে ক্ষেতে ঘুরার জন্য সকাল দশটা থেকে বেলা তিনটার মধ্যে গেলে সূর্যের আলোতে সরষে ফুল দেখতে বেশ লাগবে।
গোলাপ বাগান যাবার সহজ যোগাযোগঃ- ঢাকা থেকে উত্তরা থার্ড ফেস,মিরপুর বেড়ী বাঁধ ও গাবতলী হয়ে সাভার উপজেলার বিরুলীয়া ইউনিয়নের উত্তর শ্যামপুর গ্রামে সরাসরি নিজস্ব / ভাড়া গাড়ী নিয়ে যাওয়া যাবে। এছাড়া সাভার বাজার স্ট্যান্ড হতে বাসে বা লেগুনাতে যাওয়া যাবে।সে ক্ষেত্রে কয়েকবার যাবাহন বদল করতে হবে। আর উত্তরা বা বেড়ী বাঁধ দিয়েও নিজস্ব গাড়ী ছাড়া যেতে চাইলে কয়েক দফা গাড়ী বদল করে বিরুলীয়া ব্রীজ দিয়ে চলে যেতে পারেন।
খাবেন কোথায়? আক্রাইন/ দোসাইদ বাজারে মোটামুটি মানের রেস্টুরেন্ট পাবেন আর বিকালের নাশতার জন্য দোসাইদ বাজারে রাবিয়া খালার বানানো হরেক পদের ভর্তা দিয়ে চিতই,ভাপা আর মাল পোয়া পিঠা খাবেন তাঁর ডেড়ার দোকানে। সাথে থাকবে গরুর দুধের চা।
সাইট্টা যাবেন কি ভাবেঃ ঢাকার যে কোন প্রান্ত থেকে নিজ নিজ সুবিধা অনুযায়ী গাবতলী ও উত্তরার থার্ড ফেস এবং আব্দুল্লাহপুর হয়ে ধামরাই উপজেলার ধাঁনতারা বা কালামপুর বাজার হয়ে সাইট্টা গ্রামে যাওয়া যাবে।
পরিবহনঃ নিজস্ব বা রেন্ট কার নিয়ে গেলে সুবিধা বেশী হবে। তবে গুলিস্তান থেকে ধামরাইর বাসে ঢুলিভিটা বাস স্ট্যান্ড বা কালামপুর বাজার। সেখান থেকে অটো বা ভ্যানে চেপে সাইট্টা। বাসে গেলে কালামপুর হয়ে গেলে সময় বেশ সাশ্রয় হবে।
ঘোরার সময়ঃ সকাল সকাল সাইট্টা গ্রামের পথে বের হওয়াটাই মোক্ষম সময়।
খরচপাতিঃ বাসে গেলে জনপ্রতি ৪০০/৪৫০/= টাকাই হলেই যথেষ্ট।
লেখা: মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম
ছবি: দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

Facebook Comments
এই শীতে ঢাকার আশেপাশের দারুণ কয়েকটি স্থান..