;

বাংলাদেশে খ্রিস্ট ধর্মের আগমন ঘটেছিল যখন ষোড়শ শতাব্দীর পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল, তখন। সময়ের হিসাবে কাঁটায় কাঁটায় মিলিয়ে বলতে গেলে ১৫ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এদেশে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের আগমন। মহান যিশুর প্রবর্তিত ধর্মের বাণী নিয়ে বাংলাদেশে সবার আগে এসেছিলেন পর্তুগিজ মিশনারিরা। এদেশে আসার অব্যবহিত আগেই পর্তুগিজরা প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে ভারতবর্ষে পৌঁছান। পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে জলপথে এশিয়া আসার পথ আবিষ্কার করেন। ১৪৯৮ সালে তিনি ভারতবর্ষের দক্ষিণাংশে কালীকট বন্দরে এসে পৌঁছান। সেখান থেকে তারা ভারতবর্ষের আরো ভেতরে ঢোকার চেষ্টা চালাতে থাকেন। ১৫১৮ অথবা ১৫২০ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজরা দক্ষিণ ভারত থেকে চট্টগ্রামে এসে পৌঁছান। বাংলাদেশে খ্রিস্টধর্মের প্রচার এখানেই শুরু হয়। এখান থেকেই এদেশের আরো অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন তারা।
পর্তুগিজরা যেখানেই যেতেন, দুটি কাজ করতেন— বাণিজ্য ও ধর্মপ্রচার। দুটি উদ্দেশ্যই তাদের যে কোনো অভিযাত্রার পেছনে থাকত। সেদিনের পর্তুগিজ বণিক ও মিশনারিরা যে চট্টগ্রামে এসেছিল, তাদের চেহারা এখনকার মতো ছিল না। পর্তুগিজরা পোর্তো গ্রান্দে বা বৃহত্ বন্দর বলে যে চট্টগ্রামের কথা বলেছে, সেই বন্দর ছিল কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে। এখন বন্দরের জেটিগুলো নদীর উত্তর পাড়ে অবস্থিত, তখন ছিল উল্টো দিকে। নদীর দক্ষিণে এখন যেখানে আনোয়ারা থানা, সেখানেই কোথাও বাংলাদেশসহ পূর্ব ও উত্তর ভারতের প্রথম গির্জাটি নির্মিত হয় বলে শোনা যায়।
চট্টগ্রামে একসময় শহরের পাথরঘাটা ও ফিরিঙ্গি বাজারে রোমান ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস ছিল। তাদের অধিকাংশই পর্তুগিজদের বংশধর। ফিরিঙ্গীবাজারের নামকরণেও এ তথ্যের সমর্থন মেলে। এসব এলাকায় বেশ কিছু বাঙালি খ্রিস্টান ছিল, যাদেরকে ধর্মান্তর করা হয়েছিল। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরাই একসময় এসব এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। পাথরঘাটায় এখনো সেন্ট প্লাসিডস স্কুলের পাশে বিশাল ক্যাথলিক চার্চ আছে। এ অঞ্চলে এখনো কিছু বাঙালি খ্রিস্টান রয়েছেন। তাদের নাম শুনলে বোঝা যায়। যেমন: রদ্রিগেজ, ডোমিঙ্গুয়েজ, গনজালভেস ইত্যাদি পদবি। এরা মুখ্যত পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত অথবা তাদের দ্বারা ধর্মান্তরিত। এখানে ২৫ ডিসেম্বর খুব জাকজমকপূর্ণভাবে বড়দিন পালন করা হতো। আমি ছোটবেলায় এসব দেখেছি। এখনো ক্যাথলিক চার্চে বড়দিন পালন করা হয়, কিন্তু সেই জৌলুস নেই। ক্যাথলিকদের সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতাও নেই।


১৯৫০ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা চট্টগ্রাম ছেড়ে যেতে থাকেন। এদের সবাই যে অ্যাংলো ছিল, তা নয়। মূলত, আর্মেনীয়দের মতো ফর্সা ত্বক ও সুঠাম দেহের কারণেও অনেককে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বলা হতো। তবে মুখ্যত এরা ছিল ইংরেজিভাষী পর্তুগিজ ও পর্তুগিজ ইন্ডিয়ানস। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে এদের পূর্বপুরুষরা চট্টগ্রাম বন্দরে আসেন। চট্টগ্রামকে তারা বলতেন পোর্তো গ্রান্দে, আর হুগলিকে বলতেন পোর্তো পিকুইনো বা ছোট বন্দর। সেসময় চট্টগ্রাম বন্দর কলকাতা বন্দরের চেয়ে অনেক বড় ছিল। পর্তুগিজদের তত্পরতার কারণেও এ বন্দরের সমৃদ্ধিতে বাড়তি মাত্রা যোগ হয়েছিল। কর্ণফুলী নদী ও মোহনার আকার, আয়তন ও অবস্থান তখন অন্য রকম ছিল। সন্দ্বীপ ছিল চট্টগ্রাম বন্দর ও শহরের অনেক কাছে। ইতিহাসে আমরা দেখি, পর্তুগিজরা সন্দ্বীপ দখল করে নিজেদের কর্তৃত্বে নিয়েছিল। পর্তুগিজ অ্যাডমিরাল গনজালভেস সেখানে নিজস্ব একটি বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। মোগল সম্রাট শাহজাহানের আমলে পর্তুগিজদের চট্টগ্রাম থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। সন্দ্বীপে তাদের কলোনি উচ্ছেদ করা হয়। আরকানি ও পর্তুগিজরা মিলে বাংলাদেশের বহু ভেতরে, এমনকি সুন্দরবনের ভেতরে ঢুকেও ব্যবসা করতেন। তারা এখান থেকে মানুষ ধরে নিয়ে বিক্রি করত। ফরাসি বিপ্লবের সময় চট্টগ্রামের এক বাঙালির সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রাজা পঞ্চম লুইয়ের জনৈক রক্ষিতার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছিল। সেই বাঙালি ছিলেন এদেরই মাধ্যমে বিক্রি হওয়া দাস। যাহোক, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। এই যে অঞ্চল চট্টগ্রাম শহরের দক্ষিণ ও পশ্চিমাংশজুড়ে, তিন-চারশ বছর ধরে পর্তুগিজদের বংশধররা এখানে বসবাস করত। আমি ছোটবেলায় দেখেছি, তারা খুব জৌলুস ও জাঁকজমক নিয়ে বড়দিন আয়োজন ও উদযাপন করত। অনেকেই জানেন, সেন্ট প্লাসিডস স্কুল এ সত্তরের দশক পর্যন্ত ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ছিল। তখন তো বটেই, এখনো অনেক বনেদি খ্রিস্টান পরিবারে ইংরেজি ভাষায় কথাবার্তা চলে।


সে সময় বড়দিনকে সামনে রেখে এখানে নানা রকম ক্রিসমাস ট্রি তৈরি করা হতো। খুব সুন্দরভাবে সাজানো হতো সেসব গাছ। বড়দিনকে নিয়ে বিভিন্ন রকম গান, ক্রিসমাস কয়্যার হতো। আমি তখন ছোট। এই উত্সব, উদযাপন খুব ভালো লাগত। তাদের সঙ্গে দেখা হলে ‘মেরি ক্রিসমাস’ বলে শুভেচ্ছা জানাত। সেন্ট প্লাসিডস স্কুলের মাঠে যখন খেলতে যেতাম, আমাদের তারা খুব আদর করত। সে সময় চট্টগ্রাম শহরের লোকসংখ্যা অনেক কম ছিল। ১৯৫০ সালের দিকে শহরে খুব বেশি হলে চার-পাঁচ লাখ লোক ছিল। তখন শহরের আয়তনও অনেক ছোট ছিল। এখন শহর বড় হয়েছে, লোকসংখ্যা ৬০-৭০ লাখ হয়েছে। জিইসি মোড়ের মতো জনসমাগমের অনেক স্থান, জনবহুল লোকালয় তখন ছিল না। চট্টগ্রাম শহরের বড় সংখ্যক লোক, অন্তত ১০ শতাংশের মতো অধিবাসী ছিল বিদেশী বংশোদ্ভূত। ঢাকা অথবা দেশের অন্য কোনো শহরে এমন ছিল না। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে অ্যাংলো, ফিরিঙ্গি ও আর্মেনীয়রা চলে যেতে শুরু করেন। ষাটের দশকের মধ্যভাগ আসতেই অনেকে পুরোপুরি বিদায় নেন। এখন তো বিদেশী বংশোদ্ভূত লোক নেই বললেই চলে, থাকলেও অতি সামান্য। এখন ফিরিঙ্গি অধিবাসী চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম।
এখনো সেন্ট প্লাসিডস স্কুল ও ক্যাথলিক চার্চে ঘটা করে ক্রিসমাস পালন করা হয়। চট্টগ্রামে জামাল খান রোডে রয়েছে আরো দুটি চার্চ। একটি প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ রয়েছে প্রেস ক্লাবের পাশে। সেখানে আছে সেন্ট মেরি’স স্কুল— এটা কিন্তু প্রোটেস্ট্যান্টদের দ্বারা পরিচালিত। প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক উভয়ই ২৫ ডিসেম্বর যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন হিসেবে পালন করে। কিন্তু আসলেই ২৫ ডিসেম্বর যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন কিনা, সে ব্যাপারে আমি ইতিহাসের বইতে পড়েছিলাম একটা দ্বিমত আছে। তবে যেটি চলে আসছে, সেটিই চলছে। বিশ্বজুড়ে এখন ক্রিসমাস পালন করা হয়। আমি উত্তর আমেরিকায়ও দেখেছি। ১৯৭২ সালে প্রথম কানাডা যাই। সেখানে আমার দেখা প্রথম ক্রিসমাসটি ছিল খুব নিষ্প্রভ। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে তেলের দাম হঠাত্ করে ১ ডলার থেকে ১৭ ডলার হয়ে যাওয়ায় ক্রিসমাসটা খুবই নিষ্প্রভ ও আলোহীন ছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সালে পশ্চিমে আবার ক্রিসমাস তার নিজস্বতা ফিরে পায়, আলো ফিরে পেতে শুরু করে।
১৯৭৭ থেকে ১৯৭৮ সালের দিকে বিভিন্ন জায়গা থেকে দাওয়াত পেয়েছি ক্রিসমাস উপলক্ষে। প্রতিটি ঘরে ক্রিসমাস ট্রি সুন্দরভাবে তৈরি করা হয়। বাংলাদেশেও দেখেছি খুব সুন্দরভাবে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান এবং ফিরিঙ্গিরা ক্রিসমাস সাজাতেন। তবে আমাদের এখানে ক্রিসমাসকে ঘিরে যে উত্সব হতো, তা দেখে আমার মনে হয়েছে ওদের থেকে বেশি শিল্পরুচির পরিচয় দিতেন এখানকার খ্রিস্টানরা। কারণ আমাদের এখানে দুটো সংস্কৃতির মিশ্রণে এক ধরনের যুগলবন্দি হতো বলে সাজানোটা সুন্দর হতো কিংবা আমি বাঙালি বলে এটা মনে হয়েছে। চট্টগ্রামের কথা বলছি, ক্রিসমাস উপলক্ষে গানবাজনাও হতো এখানে। নানা রকম খাওয়া-দাওয়া হতো। ফিরিঙ্গি বাজারের ঠিক মুখেই সালাম’স বেকারি নামে একটি দোকান ছিল। তখন গনি বেকারিসহ বেশ কয়েকটি বেকারি থাকলেও সালামের কেক ছিল বিখ্যাত। বিশেষ করে প্লাম কেকটা। ক্রিসমাসের সময় খ্রিস্টান ঘরগুলোয় বেড়াতে গেলে প্লাম কেক খেতে দেয়া হতো। অন্যান্য খাবারের আয়োজনও ছিল। তবে প্লাম কেক সবাইকে দেয়া হতো।
আমার মনে হয় ক্রিসমাসের সময় অনেক বাঙালিও অংশগ্রহণ করতেন। কলকাতার ক্রিসমাসেও বাঙালিরা অনেক আয়োজন করে। সেখানে দু’বার ক্রিসমাস দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। পার্ক স্ট্রিটে রীতিমতো উত্সব চলে। পার্ক স্ট্রিটে ছিল অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের বসতি। ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের নেতা হেনরি ডিরোজিওর বাড়ি ছিল কাছেই, ইয়র্ক রোডে। রাসেল স্ট্রিট, ইয়র্ক রোডে ছিল পর্তুগিজদের বসতি। এখন সেখানে খ্রিস্টান অধিবাসী তেমন না থাকলেও ক্রিসমাসের সময় পার্ক স্ট্রিট বেশ জমকালো সাজ নেয়। কলকাতায় রয়ে যাওয়া অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের নিয়ে অপর্ণা সেন ‘৩৬, চৌরঙ্গী লেন’ নামে একটা ছবি করেছেন। বাংলাদেশেও বেশকিছু অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান রয়ে গেছেন।
আমাদের সময় ডিসেম্বরে পরীক্ষা হয়ে এক মাসের জন্য স্কুল বন্ধ হয়ে যেত। তার পর ২৫ ডিসেম্বর আর নিউ ইয়ার যখন আসত, তখন চারদিকে কেনাকাটার ভিড় লক্ষ করা যেত। ছোটবেলায় দেখেছি ক্রিসমাসের সময় দোকানগুলোকে খুব সুন্দর করে সাজানো হতো। তিনটি দোকান চট্টগ্রামে খুব প্রসিদ্ধ ছিল। এর মধ্যে একটা ছিল মেডোরা। এটি ছিল সদরঘাটে। এখানে ওয়াইনও পাওয়া যেত। চট্টগ্রামের অন্যতম নামকরা এ দোকানটি ষাটের দশকে উঠে যায়। গোছানো আর সুন্দর এ দোকানটি ছিল মেডোরা পরিবারের মালিকানাধীন। নিজেরা ইহুদি হলেও ক্রিসমাসকে ঘিরে দোকানটি চমত্কারভাবে সাজাতেন তারা। অন্য দোকানটি ছিল টেরি বাজারের আফগান স্টোর। ক্রিসমাসকে ঘিরে এ দোকানটিও সেজে উঠত নতুন করে। আর ছিল বাঙালিদের নবী স্টোর। আন্দরকিল্লা রোডে অবস্থিত এটি ছিল একটি কাপড়ের দোকান। আরো একটি ছিল রেলওয়ে মেনস স্টোর। চট্টগ্রামের বিখ্যাত এ দোকানটি এখনো টিকে আছে, তবে এটি তার জৌলুস হারিয়েছে। এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এ চারটিই ছিল চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ দোকান। এখন যদিও খুলশী মার্ট, স্বপ্ন কিংবা আগোরা হয়েছে কিন্তু মেডোরার মতো অতটা সুন্দর নয়।


পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে আমাদের বাসায় দেখেছি খ্রিস্টানদের দেখাদেখি ক্রিসমাসের সময় কেক কেনা হতো। অন্য দিন পাওয়া গেলেও ক্রিসমাসের দিন প্লাম কেকটি তাড়াতাড়ি বিক্রি হয়ে যেত, পরে গেলে পাওয়া যেত না। ডিসেম্বরের পুরো মাস ফিরিঙ্গি বাজার এবং পাথরঘাটা জুড়ে থাকত উত্সবের আমেজ। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ থেকে বিভিন্ন ধরনের আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হতো। বাংলো ধরনের ছিল ওই ঘরগুলো। দেখা যেত, সারা বাড়িতে মজার সব আলোকসজ্জা। এ বাড়িগুলো এখন আর নেই। এখন এসব বাড়ি ভেঙে বহুতল ভবন তৈরি করা হয়েছে।
এখনকার মতো নয়, আজ থেকে অর্ধশত বছর আগে ফিরিঙ্গি বাজার ছিল সুন্দর পরিপাটি একটা জায়গা। ওটা ছিল চট্টগ্রামের সবচেয়ে বনেদি এলাকা। বাঙালি পরিবার বলতে ওখানে ছিল দোভাষ পরিবার। শরবিন্দু দত্ত থাকতেন এখানে। চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ দত্ত পরিবারের আত্মীয় তিনি। চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি। পাথরঘাটা ও ফিরিঙ্গি বাজার ছাড়া চট্টগ্রাম শহরের অন্যান্য জায়গায় কিছু খ্রিস্টান ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। তবে বড়দিন ও অন্যান্য উপলক্ষে ওদের মূল আগ্রহ ছিল এ দুটো জায়গাকে ঘিরে। যেমন: জামালখান রোডে বসবাস ছিল বাঙালি প্রোটেস্ট্যান্টদের। ওদের চার্চও ছিল ওখানে। প্রেস ক্লাবের পাশে যে চার্চ ওটা কিন্তু প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ, ক্যাথলিক চার্চ নয়। সারা বাংলাদেশে কিন্তু ক্যাথলিক চার্চের সংখ্যা বেশি।
প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চও যে বিভিন্ন জায়গায় নেই তা নয়, তবে প্রাধান্য বেশি ক্যাথলিকদের। অবশ্য খ্রিস্টান অর্থোডক্স চার্চ নেই বললেই চলে। এনায়েত বাজার এবং লাভ লেনের মাঝখানে যে চার্চটি, ওটা কিন্তু প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ। আমার শৈশবে নামকরা ফুটবল খেলোয়ার ছিলেন ম্যাকওয়াহ। সেন্ট যোসেফ স্কুলে একবার পড়াতে এসেছিলেন একজন আমেরিকান সাহেব। স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে তিনি গেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে’ গান। খ্রিস্টান মেয়েরা সুন্দর করে সেজে চার্চে ঘুরত। আমাদের সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অনেক ছাপ রেখে গেছে এখানকার খ্রিস্টান সম্প্রদায়। আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের হেডকোয়ার্টার ছিল চট্টগ্রামে। রেলওয়ের অনেক কর্মচারী ছিলেন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। রেলের প্রায় ২০ শতাংশ কর্মচারী ছিলেন খ্রিস্টান। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত রেলওয়েতে বাঙালি খ্রিস্টান আর অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের উপস্থিতি বেশি ছিল। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা বাংলা বলতে পারতেন, তবে ঘরে এরা ইংরেজি বলতেন। ছোটবেলায় দেখেছি, বিভিন্ন অফিসে শর্টহ্যান্ড নিতেন খ্রিস্টান মেয়েরা। আমদানি-রফতানির ব্যবসার কাজে পাঠানো চিঠিগুলো টাইপ করতে প্রয়োজন হতো এদের। ফিরিঙ্গি বাজারের সামনে শর্টহ্যান্ড শেখানোর স্কুল ছিল। এ পেশায় ছেলেরাও আসতে শুরু করে। এখন পেশাটা উঠে গেছে। একইভাবে অপসৃত হয়েছে বড়দিনের সেই জৌলুস। তবে দিনটির ভাবগাম্ভীর্য ও মাহাত্ম্য এখনো অটুট, অমলিন।
ছবিগুলো নিয়েছেন রিচার্ড রোজারিও, গোলাম মর্তুজা আলী ও ডমিনিক হালদার
সুত্র: বনিক বার্তা, ইন্টারনেট, বিবিসি

Facebook Comments
বাংলাদেশে খ্রিষ্ট ধর্ম ও বড়দিনের সেকাল-একাল!!