;

দেশের পরিচিত অনেক জায়গা ছাড়াও স্বপরিবারে বা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানোর মত আরো অনেক প্রাকৃতিক প্রাচুর্যে ভরপুর নয়নাভিরাম সৌন্দর্যময় জায়গা রয়েছে। যা ভ্রমণ পিপাসুদের দেবে বাড়তি আনন্দ।
বাংলাদেশের একমাত্র সীমান্তহীন জেলা বরিশাল। সেই জেলার পাশেই আরো দুটো জেলা পিরোজপুর আর ঝালকাঠি। আমরা “দে-ছুট” এর বন্ধুরা ঘুরতে গিয়েছিলাম এই তিন জেলার আলিঙ্গন আটঘর – কুড়িয়ানা,আদমকাঠী আর ভিমরুলী। একটু আগে-পিছে হলেই জেলা বদল। জুলাইর মাঝামাঝি হতে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সরু খালের পানির উপর বসে পেয়ারা বাজার। তবে বাংলা মাসের পুরো শ্রাবণসহ ভাদ্র মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত হল পেয়ারা হাটের জমজমাট আসর। এবারের ভ্রমণ সঙ্গী ছিল এক ডজন বন্ধুবান্ধব। রাতের লঞ্চে চড়ে সকালে নেমেই সোজা বরিশালের বানারীপাড়া ফেরি ঘাট। সেখান থেকেই ট্রলারে চেপে শুরু নৈসর্গিক পানি পথে ভীমরুলীর উদ্দেশ্যে চলা। আমাদের ভ্রমণ নির্বীঘ্ন করার দায়িত্বে ছিল স্থানীয় তরুণ শ্রী জয়ন্ত। ফলে ট্রলার,মাহেন্দ্র,খাবার-দাবারের হোটেল খোঁজাখুঁজির কোন বাড়তি প্যারা ছিল না।
ট্রলার বেশ কিছুক্ষণ চলার পর প্রথমে থামি কুড়িয়ানা। স্থানীয় বাজারে হালকা নাশতা সারার পর আবারো ভটভট আওয়াজ তুলে ট্রলার চলে। ধীরে ধীরে আামাদের গিলে খায় অবারিত সবুজের ক্যানভাস। শাহ্আলম,হামিদ,হাসিব,মেহেদির বাড়তি উচ্ছ্বাসে খালের দু-ধারের আমড়া,পেয়ারা গাছগুলোও যেন নাচে। থামি এবার আটঘর। এখানে বসে পানির উপর ডিঙ্গি নৌকার হাট। শত শত ডিঙ্গি ভাসিয়ে বসে রয়েছে বিক্রেতা। পেয়ারা বিক্রীর মৌসুম ঘিরেই চলে এই হাট। সারিসারি নতুন নৌকা দেখে বেশ ভালো লাগে। বিভিন্ন জায়গা হতে ডিঙ্গি তৈরী করে ট্রলারে করে নিয়ে আসে এখানে। আনার দৃশ্যটাও বেশ চমৎকার। এবার ছুটি ভাসমান পেয়ারা বাজার ভিমরুলী।


যতই এগিয়ে যায় ট্রলার ততোই যেন মুগ্ধতা গ্রাস করে। স্বচ্ছ পানির খাল সরু হতে সরু। কোথাও কোথাও দুই পাশের গাছের ডাল দুই দিকে ছড়িয়ে এক অন্যরকম নয়াভিরাম সৌন্দর্যের রেখা টেনেছে। খালের উপর আলো-ছায়া খেলে লুকোচুরি। কবি জীবনান্দ দাসের ধানসিঁড়ী নদী হতেই এই খরস্রোতা ধলহার খালের উৎপত্তি। এবার চোখে পড়তে শুরু করল বাজারে নিয়ে যাওয়া পেয়ারার নৌকা। ঝর্ণার কাছাকাছি গেলে যেমন পাথুরে বোল্ডার আর রিমঝিম শব্দ শুনে বুঝা যায় যে,আর বেশী দূরে নেই। ঠিক তেমনি এখানে গানের আওয়াজে বুঝলাম চলে এসেছি কাছাকাছি।
সকাল সাড়ে নয়টায় ট্রলার ভিড়ালো ভীমরুলীর মন্দির ঘাটে। পাড়ে উঠে দেখি পেয়ারার চাইতে যেন মানুষের মেলাই বেশী । অবশ্য তখনও বাজার শুরুই হয় নাই। এই সুযোগে আশপাশ হেঁটে বেড়াই। বেলা প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ বাজার জমতে শুরু করে। খালের দুই দিক থেকেই পেয়ারা ভর্তি ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকাগুলো এসে জমতে শুরু করল। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ক্রেতা-বিক্রেতার হাকডাকে পেয়ারা হাট পুরাই জমজমাট। সেই সঙ্গে দেশের নানা প্রান্ত হতে ঘুরতে যাওয়া মানুষের শোরগোল তো আছেই। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা এখনো পেয়ারাকে গয়া নামেই ডাকে। প্রতিদিন এই ভাসমান হাটে ১২ হতে ১৮শ মণ পর্যন্ত পেয়ারা বেচাকেনা হয়। পার্শ্ববর্তী গ্রাম গুলোর বিশাল বিশাল বাগান হতে বিক্রেতারা নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে আসে। বিক্রি হয় মণ প্রতি ২২০/= টাকা হতে ৩০০/= টাকা।


স্থানীয়রা এখন বাণীজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেই পেয়ারা বাগান করে থাকে।আশেপাশের মোট ২১টি গ্রামের ৮৫০ হেক্টর জমির উপর বর্তমানে ২ হাজার ২৫টি পেয়ারা বাগান রয়েছে। শুধু কুড়িয়ানা গ্রামেই ৬৪৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারার চাষাবাদ হয়। গ্রামবাসীদের এখন অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস পেয়ারা চাষ। তাদের দেখাদেখি এখন বরিশালের বানারীপাড়া গ্রামগুলোতেও শুরু করেছে বাগান করা। যা পেয়ারা চাষে ঘটছে নিরব বিপ্লব। এই অঞ্চলের পেয়ারা স্বাদে-রসেও বেশ মুখরোচক। বেলা প্রায় একটা জুম্মা নামাজের তাড়া। নামাজ শেষে যাই কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি। ভঙ্গুর অবস্থায় এখনো কালের সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। রাজা কীর্তি নারায়ণের নাম অনুসারে কীর্তিপাশা। কিন্তু বাড়িটির প্রতিষ্ঠাতা রামজীবণ সেন। এই বংশের রোহিনী রায় চেীধুরী ও তপন রায় চৌধুরী দুটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তৎকালীন সময়ে তাদের রয়েছে বহু অবদান।
কিভাবে যাবেন?
ঢাকা হতে বরিশাল এসি/নন এসি বাস সার্ভিস রয়েছে। তবে লঞ্চে হবে আরামদায়ক বেশী। প্রতিদিন সদরঘাট হতে রাত ৮টা হতে ৯টা৩০ মিনিট পর্যন্ত বিভিন্ন কোম্পানীর লঞ্চ বরিশালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। বরিশাল জাহাজ ঘাট হতে সিএনজি/মাহেন্দ্রে কিংবা নথুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ড হতে সরাসরি বানারীপাড়া বা ভীমরুলী যাওয়া যায়।
ভাড়া বাসে ৫৫০/= টাকা থেকে ৭৫০/=টাকা। লঞ্চে ডেকে ১৫০/=টাকা। সিঙ্গেল কেবিন ৯০০/=,১০০০/=ডাবল কেবিন ১৮০০/=টাকা মাত্র। সিএনজি/মাহেন্দ্র ভাড়া ৫০০/=টাকা। ট্রলার ভোর হতে বিকাল পর্যন্ত ২০০০/=টাকা।
কোথায় খাবেন?
ভীমরুলী ও কুড়িয়ানা বাজারে বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। আগে থেকে বলে রাখলে চাহিদা অনুযায়ী খাবার মিলবে।
স্থানীয় কারো সহযোগিতা নিতে চাইলে ফোন দিয়ে কন্টাক্ট করতে পারেন শ্রী জয়ন্ত হালদারের সঙ্গে। ০১৭১০৭৮০০৮৯ নাম্বারে।
থাকবেন কোথায়?
পেয়ারার ভাসমান হাট দেখার পর যদি কেউ বরিশালের বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে চান তাহলে শহরের চকবাজারে বেশ কিছু ভালোমানের আবাসিক হোটেল রয়েছে।
লেখকঃ মোঃ জাভেদ হাকিম
ছবিঃ “দে-ছুট”ভ্রমণ সংঘ

Facebook Comments
ঈদের ছুটি কাটুক পেয়ারা’র হাটে