;

কেওক্রাডং

প্রকৃতি কন্যা বান্দরবানের পাহাড়শ্রেণী ট্রেকারদের জন্য এক স্বর্গ। সব উঁচু উঁচু পাহাড় চূড়া এ অঞ্চলকে ঘিরে রয়েছে। পাহাড়ি সৌন্দর্য আর রোমাঞ্চকর দুর্গম পথ তাই সকল ট্রেকারদের টানে দুর্নিবার আকর্ষণে। ট্রেকারদের দেখানো সেসব দুর্গম পথে হাঁটতে শুরু করেছেন এডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটকরাও। শুধু পাহাড় নয়, মেঘের ভেলা, অসংখ্য ঝর্ণা ও জলপ্রপাতও টানে চুম্বকের মতো পর্যটকদের বান্দরবানের দিকে। আর ট্রেকারদের সবচেয়ে প্রিয় গন্তব্য কেওক্রাডং রয়েছে এই বান্দরবানেই। আকাশ ছোঁয়ার ইচ্ছে যাদের মনে তারা চাইলেই ঘুরে আসতে পারেন বাংলাদেশের পঞ্চম উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং থেকে। এর সর্বোচ্চ চূড়াতে পৌঁছালে মনে হবে আকাশ আপনার কতটা কাছে। চাইলেই হারিয়ে যেতে পারবেন মেঘের ভাঁজে।

কেওক্রাডং

কেওক্রাডং বান্দরবানের রুমা উপজেলায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত । এর উচ্চতা ৯৮৬ মিটার। এই পাহাড়ের চূড়া থেকে পৃথিবীটা যেন স্বর্গের মত মনে হয় । পাহাড়ের পর পাহাড় আর তার ওপর বিছানো সবুজের গালিচা। কোথাও জুম চাষ হচ্ছে, কোথাও বা বুনো ঝাড়। ছোট বড় পাহাড়, ঘন জঙ্গল এবং নানারকমের পশুপাখিতে পরিপূর্ণ এই দুর্গম এলাকাটি অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। এই অপার্থিব সৌন্দর্য আপনাকে বিমুগ্ধ করবে। দূর থেকে কেওক্রাডং এর চূড়া শূন্যে মিলিয়ে আছে বলে মনে হয় কিন্তু চূড়ায় উঠলে পাহাড় আর মেঘের মিতালী আপনাকে সম্মোহিত করবে এক মায়াবী আকর্ষণে। বৃষ্টি, বাতাস আর মেঘ সবসময় দখল করে নেয় চূড়ার আশপাশ। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সবুজের ঘোর লাগানো সৌন্দর্য, ঝর্ণাধারা, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর মেঘ পাহাড়ের লুকোচুরি খেলা। এ যেন পৃথিবীর বুকে এক টুকরো সবুজ স্বর্গ।

কেওক্রাডং যাবার উপায়:

আপনাকে প্রথমে বান্দরবান আসতে হবে কেওক্রাডং যাবার জন্যে। দেশের যেকোন জেলা থেকেই বান্দরবানের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল। ঢাকার কলাবাগান, সায়দাবাদ এবং ফকিরাপুল থেকে শ্যামলী, হানিফ, ইউনিক, এস আলম, ডলফিন ইত্যাদি পরিবহনের বাস বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এর যেকোন একটি বাসে চড়ে সহজেই বান্দরবানের আসতে পারেন। এসব নন-এসি ও এসি বাসের জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৫৫০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে। ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান যেতে সময় লাগে ৮-১০ ঘণ্টা।

এছাড়া মহানগর, তূর্ণা কিংবা চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে করে প্রথমে চট্টগ্রামে তারপর সোজা বান্দরবানে চলে যেতে পারেন। চট্টগ্রাম শহরের বদ্দারহাট থেকেও পূবালী ও পূর্বানী পরিবহনের নন-এসি বাস ৩০ মিনিট পরপর বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

কেওক্রাডং

এবার বান্দরবান শহর থেকে বগালেক যেতে প্রথমে যেতে হবে রুমা বাজার। বান্দরবান থেকে রুমা বাজারের দূরত্ব ৪৮ কিলোমিটার। লোকাল বাস কিংবা চাঁন্দের গাড়ি/জীপে করে রুমা বাজার যাওয়া যায়। বাসে যেতে হলে বান্দরবানের রুমা বাস স্ট্যান্ডে যেতে হবে। সেখান থেকে ১ ঘণ্টা পর পর বাস রুমার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। দলগত ভাবে গেলে রুমা বাজার যেতে পারেন জীপ/চাঁন্দের গাড়িতে করে। এক গাড়িতে ১০-১৫ জন যাওয়া যায়। বান্দরবান শহরের জীপ স্টেশন ৩০০০-৪০০০ টাকা ভাড়ায় গাড়ি নিতে হবে। জীপে করে গেলে সময় লাগবে ২ ঘণ্টার মত।

রুমা বাজার পৌঁছে বগালেক যাবার জন্যে আপনাকে গাইড ঠিক করে নিতে হবে। গাইড নেয়া বাধ্যতামূলক। রেজিস্টার্ড গাইড আছে এমন কাউকে ঠিক করে নিতে হবে। রওনা হবার আগে রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে বগালেক যাবার অনুমতি নিতে হবে। সেখানে নিয়ম অনুযায়ী নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার লিপিবদ্ধ করতে হবে। এই কাজ গুলো করার জন্যে গাইড আপনাকে সাহায্য করবে। আর অবশ্যই মনে রাখবেন বিকেল ৪ টার পর রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে বগালেক যাবার অনুমতি কিছুতেই মিলবেনা। রুমা বাজার থেকে নতুন করে জিপ/চাঁন্দের গাড়ি রিজার্ভ করে যেতে হবে কমলাবাজার পর্যন্ত। তবে বর্ষাকালে প্রায়ই ভূমিধ্বসের কারণে ১১ মাইল নামক জায়গা পর্যন্ত আগানো যায় বড়জোর। তবে শুকনো মৌসুমে চাঁন্দের গাড়ি বগালেক অবধি পৌঁছায়। রুমা বাজার থেকে ১১ মাইল কিংবা কমলাবাজার পর্যন্ত রাস্তা আপনাকে ফ্রিতে রোলার কোস্টারে চড়ার স্বাদ দিবে নিশ্চিত। কমলাবাজারের পাশ থেকেই খাড়া পাহাড় উঠে গেছে আকাশপানে, এটির চূড়াতেই বগালেক। কমলাবাজার থেকে ২০-৩০ মিনিট পাহাড় বেয়ে উপরে উঠে গেলেই বগালেক ধরা দিবে আপনার দৃষ্টিসীমায়। সাধারণত এ যাত্রায় পর্যটকগন বগালেকে রাত্রিযাপন করে থাকেন। পরদিন খুব সকালে উঠে গাইডসহ রওনা দিবেন কেওক্রাডংয়ের উদ্দেশ্যে। ৩-৪ ঘণ্টা ট্রেকিং করে কেওক্রাডংয়ের চূড়ায় পৌঁছাতে পারবেন। বগালেক থেকে কেওক্রাডং এই পুরো পথটায় আপনাকে বেশ কিছু খাড়া পাহাড় পার হতে হবে।

রুমাবাজার থেকে বগালেক (১১ মাইল কিংবা কমলাবাজার) পর্যন্ত চাঁন্দের গাড়ির ভাড়া কমবেশি ২০০০ টাকা। তবে পর্যটন মৌসুমে তা ৪০০০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আর গাইডকে প্রতিদিনের জন্য দিতে হবে ৬০০-৮০০ টাকা।

কেওক্রাডংয়ে থাকা ও খাওয়ার উপায়:

কেওক্রাডংয়ে যদি রাত কাটাতে চান এর চূড়ার কাছেই আদিবাসী কটেজ আছে। গাইডের মাধ্যমে আগে থেকেই কথা বলে রাখতে পারেন অথবা সেখানে গিয়ে কথা বলে ঠিক করতে পারবেন। এক রুমের কটেজে কয়েকজন থাকতে পারবেন। জনপ্রতি ১০০-১৫০ টাকা ভাড়া। খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা আদিবাসী কটেজেই করতে হবে। সাধারণত ১০০-২০০ টাকার খাবার প্যাকেজ পাওয়া যায়। ভাত, ডিম, আলুভর্তা, পাহাড়ি মুরগি দিয়েই হয় খাবারের আয়োজন। এই জন্য আগে থেকেই বলে রাখতে হবে কি খাবেন ও কতজন খাবেন। গাইডের সাহায্যে এই সব কিছুর ব্যবস্থা করে নেবেন।

ভ্রমণ টিপস:

১.ভাল গ্রিপের জুতা বা কেডস পড়তে হবে। অবশ্যই সাথে ব্যাগপ্যাক নেবেন এবং যথাসম্ভব কম কাপড় নেবেন। সানগ্লাস, ছাতা, পানি, মশার কয়েল/স্প্রে, প্রয়োজনীয় ফাস্ট এইড ও পাওয়ার ব্যাংক নিতে ভুলবেন না।

২. বগালেক ও কেওক্রাডং এ সব মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না, শুধু রবি ও টেলিটকের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। তাই সাথে করে কোন একটা সিম রাখুন।

৩.ট্রেকিং এর সময় সাথে পর্যাপ্ত পানি রাখুন।

৪. বগালেকে গোসল করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, তাই লেকে গোসল করার সময় সতর্কতা অবলম্বন করুন।

৫. আদিবাসী মানুষের জীবন যাত্রা সমতলের মানুষের মত নয়, তাদের অসম্মান হয় এমন কিছু করবেন না।

৬. আদিবাসীদের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।

Pic: Asif Rahat, Porag Ahmed and Internet

Contributor: Rubaida Akter

Facebook Comments
কেওক্রাডং: বাংলাদেশের পঞ্চম উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ