English

বায়তুর রউফ মসজিদ

নান্দনিক স্থাপত্যের বায়তুর রউফ মসজিদ : ঢাকা

বায়তুর রউফ মসজিদ
বায়ু চলাচলের জন্য মসজিদের দেয়ালে রয়েছে এমন ইটের জালি। ছবি : সংগৃহীত

দেশের বিভিন্ন প্রান্তেই ছড়িয়ে ছিটিতে আছে নান্দনিক, ঐতিহাসিক ও পুরাতাত্ত্বিক নানান মসজিদ। কিন্তু ঢাকার অদূরে দক্ষিণখান থানার ফায়েদাবাদে অবস্থিত বায়তুর রউফ মসজিদ (Baitur rauf masjid) সবার চেয়ে ব্যতিক্রম হয়ে আছে এর পরিবেশ বান্ধব স্থাপত্যের দরুন।

দুর্দান্ত স্থাপত্যশৈলী, গঠন এবং সৌন্দর্যের এই মসজিদটি ঢাকার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপত্যের একটি। ২০১২ সালে মসজিদটি নির্মাণ ও ডিজাইন করেন মেরীনা তাবাসসুম। নানী সুফিয়া খাতুনের মসজিদের জন্য ওয়াকফ করা জমির উপর তিনি এই মসজিদটি নির্মাণ করেন।

হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর সময়কার মসজিদগুলো যেমন নামাজের পাশাপাশি মিলনমেলা হিসেবে কাজ করতো তেমনই এই মসজিদটিও এলাকাবাসীর মিলনমেলায় রূপান্তরিত হয়েছে। এলাকা বাসীর সহযোগিতা নিয়েই নির্মাণ করা হয় নান্দনিক এই মসজিদটি।

মসজিদের স্থাপত্য

উপর থেকে দেখলে বুঝা যায়, মসজিদটির ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যেনো একটা চতুর্ভুজের মাঝে একটা বৃত্ত গড়ে উঠেছে, আবার তার ভেতর আরেকটি ৫০ ফুট বাই ৫০ ফুটের চতুর্ভুজ। মেরীনা তাবাসসুম আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে রেইনফোর্সড কংক্রিট দিয়ে কলাম বিহীন এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। যেটি ১৩ ডিগ্রি কোনাকুনি হয়ে বসে আছে কিবলামুখী হয়ে।

সুলতানি আমলের মসজিদের স্থাপত্যের অনুসরণে নির্মাণ করা হয় বায়তুল রউফ মসজিদটি। ৮টা পেরিপেরাল কলামের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটি সম্পূর্ণ ইটের তৈরি এবং কোন রং বা প্লাস্টারের কাজ করা হয় নি। বাহিরের দেয়ালে রয়েছে ইটার জালি যাতে প্রাকৃতিক বাতাস সহজেই মসজিদের ভেতরে যাওয়া আসা করতে পারে।

মসজিদের ছাদে রয়েছে ছোট ছোট অনিয়মিত বিরতিতে বিভিন্ন ছিদ্র। দিনের বেলা এইসব ছিদ্র দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করে। এছাড়াও দিনের আলোর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে মসজিদের চারপাশে রয়েছে আলোক-স্থল। যার ফলে মসজিদের তাপমাত্রা সারাবছরই অপরিবর্তিত থাকে।

বায়তুর রউফ মসজিদ
সূর্যের একেক অবস্থান থেকে একেকভাবে আলোক রশ্মির এমন অদ্ভুত প্রতিফলন দেখা যায় এখানে। ছবি : সংগৃহীত

মসজিদের ফ্লোর পাথর গুড়ার মোজাইক ও কাচের বিভাজনে নির্মিত। একতলা বিশিষ্ট ৭৫৪ বর্গ মিটারের মসজিদের পরিচিত চিত্র ডোম বা মিনার নেই। নেই কোনো আসবাবপত্র। মসজিদটিতে একসাথে ৪৫০ জন মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে। নান্দনিক এবং আধুনিক স্থাপত্যের এই মিশেল মসজিদটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ২০১৬ সালে দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে এটি আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার পুরস্কারে ভূষিত হয়। এই পুরষ্কার টি স্থাপত্যের নোবেল হিসেবে বিবেচিত।

মসজিদের সম্মুখভাগে রয়েছে পাকা পরিসর। স্থানীয়দের অংশগ্রহণে সামাজিক এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে মসজিদটি। মসজিদের ইমাম স্থানীয় নারীদেরও এখানে আসার জন্য উৎসাহিত করেন। সম্মুখভাগের ফাঁকা জায়গায় বাচ্চা ছেলেরা খেলাধুলা করতেই ব্যস্ত থাকে সব সময়।

স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম মসজিদটির বিশেষত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন :

‘মসজিদটি তৈরি হয়েছে একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। প্রচলিত মসজিদগুলোর ধরন থেকে আলাদা। আর মসজিদটি নির্মিত হয়েছে স্থানীয় ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে, অংশগ্রহণমূলক ধারণা থেকে। খরচও এসেছে সবার কাছ থেকে। পরিবেশবান্ধব এবং আলো-বাতাসের বিষয়টি মাথায় রেখে এর ডিজাইন করেছি। ইতিহাস, সংস্কৃতি, আবহাওয়াসহ নানা বিষয় মাথায় রেখে এর নির্মাণ করা হয়েছে। আর ব্যবহৃত সব উপকরণই স্থানীয়।’

২০১৭ সালে মসজিদ প্রাঙ্গণে ‘অন্যকে আলিঙ্গন’ নামে একটি ফটো এক্সিবিশন করা হয়। মসজিদে তোলা ছবি নিয়ে এই আয়োজন করেন বিখ্যাত আলোকচিত্রি শহিদুল আলম।

যেভাবে যাবেন :

বায়তুর রউফ মসজিদটি আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে পূর্ব দিকে গিয়ে রেললাইন পেরিয়ে দক্ষিনখান থানার ফায়েদাবাদে অবস্থিত। ঢাকা থেকে আব্দুল্লাহপুরের সরাসরি বাস রয়েছে। আব্দুল্লাহপুর নেমে রাস্তার পূর্ব পাশের বেড়িবাধ রোডে ব্যাটারিচালিত অটো বা রিকশা  আছে, ট্রান্সমিটার মোড় যেতে ভাড়া ১০-১৫টাকা৷  ট্রান্সমিটার মোড় থেকে হাতের বামে গলির ভেতর  দিয়ে গেলে এক দেড় মিনিট পরেই মসজিদটি দেখতে পাবেন।

 

সাখাওয়াত হোসেন

 

এস এম