;

সুচিত্রা সেনের বাড়ি

বাঙালির হৃদয়ে আজও অমলিন এক নাম মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুগ্ধ হয়ে চলছে তাঁর অভিনয় গুণ আর মোহনীয় রূপে। সুচিত্রা সেন মূলত বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ‘মহানায়িকা’র খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের বিপরীতে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি অর্জন করেছিলেন বিশেষ জনপ্রিয়তা। পথে হলো দেরী, সপ্তপদী, শাপমোচন, সাগরিকা, বিপাশাসহ অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করে মানুষের মন জয় করেন কিংবদন্তী এই নায়িকা। ১৯৭৮-এ মুক্তি পায় তার অভিনীত শেষ ছবি ‘প্রণয় পাশা’। তিনি পরপারে চলে গেলেও তার অবিস্মরণীয় এসকল চলচ্চিত্রের জন্য আজীবন অক্ষয় হয়ে রয়ে যাবেন ভক্তদের হ্রদয়ে। আর এই কিংবদন্তি নায়িকার পৈত্রিক বাড়ি হলো পাবনায়। যেকোনো ছুটিতে মহানায়িকার স্মৃতিধন্য এই বাড়িটি দেখে আসতে পারেন আপনিও।

পাবনা শহরের গোপালপুর এলাকার হেমসাগর লেনে সুচিত্রা সেনের বাড়ি অবস্থিত। বাড়িটি এখন ‘সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা’ হিসেবে পরিচিত। বাড়ির মূল ফটক দিয়ে ঢুকে বিরাট উঠান পার হয়ে সিঁড়িবারান্দা। তারপর মূল ঘরগুলো। ঘরের দেয়ালজুড়ে ছোট–বড় ফ্রেমে বাঁধানো মহানায়িকার নানা ছবি, যেখানে কোথাও তিনি সাবলীল বাঙালি নারী আবার কোথাও ইংরেজি ঢংয়ে নায়িকার বেশে, কোথাও তাকে দেখা যাচ্ছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিশে একাকার। এটি পাঁচ কক্ষের একতলা পাকাবাড়ি । বেশ চওড়া বারান্দা । ভেতর বারান্দার পশ্চিমে ছাদে উঠার সিঁড়ি । আঙিনার উত্তর পাশে টিনশেড রান্নাঘর । বাড়ি জুড়ে অনেক রকম ফুল ফলের গাছ । এই বাড়িতেই বেড়ে উঠেছেন চলচ্চিত্র জগতের এই কিংবদন্তী ।

তাঁর লেখাপড়া শুরু এই পাবনার বাড়িতেই । সুচিত্রার ডাক নাম ছিল রমা । বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন পাবনা মিউনিসিপ্যালিটির স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ও মা ইন্দিরা দেবী ছিলেন গৃহবধূ। বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছোট্ট রমাকে ভর্তি করে দেন পাবনা মহাখালী পাঠশালায় । ওই পাঠশালাতেই চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন তিনি। পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন পাবনা বালিকা বিদ্যালয়ে ( বর্তমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় )। এই বাড়িতেই নবম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় ঢাকার জমিদার আদিনাথ সেনের ছেলে দিবানাথ সেনের সাথে সুচিত্রার বিয়ে হয় । ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ১৯৫১ সালের মাঝামাঝিতে সুচিত্রা সেনের বাবা করুণাময় দাসগুপ্ত সপরিবারে পাড়ি জমান কলকাতায়। এখানেই কেটেছে সুচিত্রা সেনের জীবনের প্রথম ১৬টি বছর। এরপর থেকে বাড়িটিতে সরকারি বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বসবাস করতেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে এই বাড়িটি প্রথমে রাষ্ট্রীয় ও পরে ব্যক্তিগত দখলদারিত্বে চলে যায় ।

সুচিত্রা সেনের বাড়ি

পাবনা জেলা প্রশাসন এই বাড়িটিকে সুচিত্রা সেনের স্মৃতি সংগ্রহশালা হিসেবে গড়ে তুলেছে। মহানায়িকার স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়ির প্রতিটি কোণে। এখানে কিছু ফেস্টুনে তার জীবন আর কর্মের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেখতে পাবেন। সেই গান “এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো”। আরো আছে সুচিত্রা সেনের পছন্দ-অপছন্দ এবং নানা অজানা বিষয় নিয়ে লেখা ফেস্টুন। এখানে অবিরাম বেজে যায় একটার পর একটা সুচিত্রা সেন অভিনীত সিনেমার গান।

সংগ্রহশালার ভেতরে বাড়ির বেশ কটা ঘর এখনো ফাঁকা পড়ে আছে। ধীরে ধীরে এগুলোকেও সাজানো হবে সুচিত্রা সেনের স্মৃতিবিজড়িত জিনিসে। শৈশব ও কৈশোরের অনেকটা সময় সুচিত্রা সেন কাটিয়েছেন এই বাড়িতে। একটা দেয়ালের ফেস্টুনে লেখা আছে ঘর সাজানোর প্রতি সুচিত্রা সেনের বিশেষ দুর্বলতার কথা। এই বাড়িটির প্রতিটি কোণেই সুচিত্রা সেনের বেড়ে ওঠা, তার শৈশব ও কৈশোরের নানান স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
১০ টাকার টিকিট কেটে এই বাড়িতে ঢুকতে হয়। এখানে এলে এই বাড়ির পাশেই যে পুরনো নামহীন জমিদার বাড়িটি আছে এটি দেখে আসতে ভুলবেন না।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সকল জেলা ও শহর থেকে যমুনা সেতুর মাধ্যমে সড়কপথে সরাসরি পাবনা যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে যমুনা সেতু হয়ে পাবনা যেতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগবে। ঢাকা থেকে বাদল, শ্যামলী, দুলকি, মহানগর ইত্যাদি বাস পাবনায় যায়।
পাবনা শহর থেকে রিকশায় চড়ে সহজেই পৌঁছে যেতে পারবেন সুচিত্রা সেনের বাড়িতে।

যেখানে থাকবেন:

পাবনা শহরে থাকার জন্য নানান মানের হোটেল রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হোটেল প্রবাসী ইন্টার ন্যাশনাল, হোটেল পার্ক, হোটেল শিলটন, ছায়ানীড় হোটেল, প্রাইম গেস্ট হাউস, মিড নাইট মুন চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, স্বাগতম হোটেল এন্ড চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি।


ছবি – সংগৃহীত

তথ্য সংগ্রহ ও উপস্থাপন – রুবাইদা আক্তার

Facebook Comments
মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বাড়ি, পাবনা