;

সমাজশাহী মসজি

আমাদের দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা আমাদের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে এখনো স্বমহিমায় নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। প্রতিটি জেলার এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা যেমন আমাদের দেশের সৌন্দর্যের অন্যতম অনুষঙ্গ তেমনি পর্যটকদেরও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এসকল স্থাপনার মধ্যে একটা বড় অংশ জুড়ে আছে দেশের নানান স্থানের মসজিদ। এই মসজিদগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে নানান ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মৃতি। এগুলো যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনি ইতিহাসের ধারক ও বাহক। তেমনই একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ হলো পাবনার সমাজশাহী মসজিদ।

পাবনা জেলার চাটমোহর থানার সমাজ গ্রামে অবস্থিত ৪৬৫ বছরের সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক ‘সমাজশাহী মসজিদ’। করতোয়া নদী সংলগ্ন চাটমোহর থানা থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে এই মসজিদটি অবস্থিত। ঐতিহাসিক ‘সমাজ শাহী মসজিদ’টি ১৫৫২ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সমির বা সেলিম শুরের আমলে ধর্মদরদি মাসুম খাঁ কাবলি কর্তৃক নির্মিত হয়। প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পের অপূর্ব এক নিদর্শন হলো এই মসজিদ। এ অঞ্চলে যেসকল প্রাচীন স্থাপত্য কলা রয়েছে তার মধ্যে এটি অন্যতম। এ গ্রামের অনেক ঐতিহাসিক এবং প্রাচীন নিদর্শন বিলুপ্ত হয়ে গেলেও সমাজ শাহী মসজিদ এখনও স্বমহিমায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগের প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে।

কথিত আছে, বাংলা ও বিহারের শাসনকর্তা থাকাকালীন সময়ে শেরশাহ অবসর কাটাতে আসতেন এ গাঁয়ে। পাঠান সৈন্যদের একটি ঘাঁটিও ছিল এখানে। শেরশাহ ভালোবেসে ফেলেন এক ব্রাহ্মণ কন্যাকে। তাকে বিয়ে করে কিছুদিন বাস করেন এ গাঁয়ে তখনো নির্মাণ হয়নি এ মসজিদ। মসজিদের জায়গায় ছিল এক দরবেশের আস্তানা। এক গভীর রাতে বাঁশীর সুরে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে আসেন শেরশাহে স্ত্রী। সুর ভেসে আসছিল ঐ দরবেশের আস্তানা থেকে। সুর অনুসরণ করে বেগম গিয়ে ঢোকেন আস্তানায়। শেরশাহ এ ঘটনা জানতে পেরে স্ত্রীকে ত্যাগ করে চলে যান বিহারে। এ সময় বেগম ছিলেন ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ধর্ম কন্যা রূপে বেগম দরবেশের আস্তানায় স্থান পায়। সে আস্তানাতেই তার এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। দরবেশ তার নাম রাখেন সেলিম। সেলিম বড় হয়ে পিতার পরিচয় উদ্ধার করে। এ সময়ে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন শাহাজাদা সেলিম। তখনই সেলিম দরবেশের ঐ আস্তানায় মসজিদটি নির্মাণ করেন। অনেকের বিশ্বাস ঐ দরবেশই হলেন হযরত আশরাফ জিন্দানী ( রহঃ )।

এই মসজিদটি দীর্ঘ দিন পরিত্যক্ত থাকার পর ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এর আগে ১৯৪২ সালে ভারত সরকার মসজিদটি একবার পুনর্নির্মাণ করেন।

৩০ হাত উচ্চতার এ মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৩৪ হাত, প্রস্থ ১৫ হাত। ছোট-বড় মিলিয়ে গম্বুজ সংখ্যা মোট তিনটি। বড় গম্বুজগুলোর নিচের দিকে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য। মসজিদটির বারান্দায় কষ্টিপাথরের কালো দুইটি স্তম্ভ প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর ঐতিহ্যের প্রমাণ বহন করে। চারপাশের দেয়ালে টেরাকোটা নকশার অসংখ্য ফলক দর্শনার্থী ও মুসল্লিদের নজর কাড়ে খুব সহজেই। মসজিদের রয়েছে তিনটি মূল দরজা ও একটি মেহরাব। মূল তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির চার কোণে আরো চারটি ছোট স্তম্ভ গম্বুজ রয়েছে। মসজিদের ভেতরে ও বাইরের দেয়ালে রয়েছে দু’টি কৃষ্ণবর্ণ পাথর। আর তাতে রয়েছে পবিত্র কোরআনের খোদাই করা আয়াত। এ মসজিদ থেকে কোরআনের আয়াত লিখিত দু’টি শিলালিপি ১৯৪২ সালে ভারতের যাদুঘরে নেয়া হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। মসজিদটির দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দেখতে পাবেন হযরত আশরাফ জিন্দানী (রহঃ) এর মাজার। তার পাশেই আছে এক বিশাল দীঘি। ঐতিহাসিক এই মসজিদটি দেখতে প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের আগমন ঘটে।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সকল জেলা ও শহর থেকে যমুনা সেতুর মাধ্যমে সড়কপথে সরাসরি পাবনা যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে যমুনা সেতু হয়ে পাবনা যেতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগবে। ঢাকা থেকে বাদল, শ্যামলী, দুলকী, মহানগর ইত্যাদি বাস পাবনায় যায়।
পাবনা শহর থেকে যেকোনো লোকাল বাহনে চড়ে পৌঁছে যেতে পারবেন চাটমোহরে।

যেখানে থাকবেন:

পাবনা শহরে থাকার জন্য নানান মানের হোটেল রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হোটেল প্রবাসী ইন্টার ন্যাশনাল, হোটেল পার্ক, হোটেল শিলটন, ছায়ানীড় হোটেল, প্রাইম গেস্ট হাউস, মিড নাইট মুন চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, স্বাগতম হোটেল এন্ড চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি।


ছবি – সংগৃহীত

তথ্য সংগ্রহ ও উপস্থাপন – রুবাইদা আক্তার

Facebook Comments
শতবর্ষী সমাজশাহী মসজিদ, পাবনা