;

অপরাজেয় বাংলা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অপরাজেয় বাংলা যা মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত একটি ভাস্কর্যের নাম। মাত্র ৩ জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন এমন আকৃতিতে তৈরি একটি ভাস্কর্য। যদিও সংখ্যাটি মাত্র তিন তবে বস্তুত তারা একটি সমগ্র জাতির কথা বলছে। যেই জাতি শোষিত হয়েছে নিজ দেশেরই আরেকটি অংশের দ্বারা। সেই জাতি বায়ান্নতে নিজেদের ভাষার জন্য লড়াই করেছে ক্ষমতাসীনদের সাথে। যেই জাতি পঞ্চাশের মন্বন্তর দেখেছে,একটি সফল গণ অভ্যুত্থানের পথ পেরিয়ে সংগ্রামের পথ এসেছে। বার বার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আর বার বার উঠে দাঁড়িয়েছে। সেই সমস্ত সংগ্রাম যুদ্ধ ত্যাগের ছবিই দুইজন পুরুষ এবং একজন নারীর ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে।

বাংলার ইতিহাস আর একাত্তরকে জানা যে কোন মানুষের চোখে জল এনে দিতে পারে ‘অপরাজেয় বাংলা’। ঠিক নামের মতোই সদা উজ্জ্বল দৃপ্ত তার ভঙ্গি। সবার ডানের মূর্তিটি দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে নিন হাতে ধরে রেখেছেন রাইফেল, তিনি প্রতিনিধিত্ব করছে বিশাল সংগ্রামী জনগোষ্ঠীর। তার প্রতিকৃতিটির মডেল হয়েছেন আর্ট কলেজের ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম বেনু। এক হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল আর অন্য হাতে গ্রেনেড নিয়ে মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন যে টগবগে সাহসী তরুণ তার মডেল হয়েছেন সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে। ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে যেই সেবিকাটা এগিয়ে চলেছেন মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের সাথে, একাত্তরে নারীদের অবদানের একটি অংশের প্রতিচ্ছবি তিনি। এই সাহসী নারীর প্রতিকৃতির মডেল হয়েছেন হাসিনা আহমেদ।

ভাষ্কর্যটি নির্মাণে মডেল হয়েছিলেন ডান থেকে মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম বেনু,

মাঝে সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে এবং সর্ববামে হাসিনা আহমেদ।

অপরাজেয় বাংলা প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ- ডাকসুর উদ্যোগে। তবে এর শুরুর গল্পটা মোটেও সুখকর নয়। মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অবদান ছিল অনন্যসাধারণ। সেই অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে উদ্যোগী হয় ডাকসু। এই জন্য বটতলার কাছেই তারা তৈরি করে একটি ভাস্কর্য। এটির নকশা করেন শিল্পী আব্দুল লতিফ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতীক সেই ভাস্কর্যকে কে বা কারা রাতের আঁধারে ক্ষতিগ্রস্থ করে রেখে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়ের উপাচার্য ড. আবদুল মতিন চৌধুরী, ডাকসু ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মাববুব জামানসহ ডাকসু নেতৃবৃন্দ এবার উদ্যোগী হন এমনভাবে ভাস্কর্য নির্মাণে যার ক্ষতি করাও হবে দুঃসাধ্য। ৬ ফুট শক্ত মজবুত বেদির ওপর এবার তৈরি হয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিকৃতি। এবার এর নাম দেওয়া হয় স্বাধীনতা ভাস্কর্য।

এটি আর শুধু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের প্রতীক থাকে না, বরং ভাস্কর্যটি হয়ে ওঠে সারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রতীক। তবে ভাস্কর্যটির যথাযথ নামকরণের কৃতিত্ব দৈনিক বাংলার সাংবাদিক সালেহ চৌধুরীর। তিনি দৈনিক বাংলায় নিজ উদ্যোগে একটি প্রতিবেদন করেন এই স্থাপত্যটি নিয়ে। সেখানে তিনি এটিকে ‘অপরাজেয় বাংলা’ হিসেবে প্রথম আখ্যা দেন। সেখান থেকেই নামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে এই নামই প্রতিষ্ঠিত হয়।

অপরাজেয় বাংলা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়অপরাজেয় বাংলা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৭২ সালে এর নকশার কাজ এরপর ১৯৭৩ সালে মূল ভাস্কর্যের কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৭৯ সালে। ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট, প্রস্থ ৮ ফুট, ব্যাস ৬ ফুট। ভাস্কর্যের বেদীর উচ্চতা ৬ ফুট। ১৯৭৯ সালের মহান বিজয় দিবসে সকাল ৯টায় ভাস্কর্যটির উদ্বোধন করা হয়। অপরাজেয় বাংলা’ এর স্থপতি চিত্রশিল্পী সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত এই ভাস্কর্যটিকে দেখতে ঢাকার বাইরে থেকে তো বটেই দেশের বাইরে থেকেও পর্যটকরা আসেন। বাংলাদেশে নির্মিত তাৎপর্যপূর্ণ ভাস্কর্যগুলোর মাঝে এটিই সবচেয়ে বেশি পরিচিত।

ছবি – ইন্টারনেট

কন্ট্রিবিউটর – মীর মাইনুল ইসলাম

Facebook Comments
ইতিহাস : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা