;

রক্তধারা স্মৃতিসৌধ
ইলিশের শহর চাঁদপুর ভ্রমণপ্রেমী ও ভোজন রসিক সবার জন্যই প্রিয় একটি ভ্রমণ গন্তব্য। মেঘনা নদীর অপার সৌন্দর্য আর তিন নদীর মোহনা চাঁদপুরকে করেছে অনন্য। শুধু নদীর সৌন্দর্যই নয়, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও চাঁদপুরে কম নেই। পুরো চাঁদপুর জুড়ে ছড়িয়ে আছে নানান দর্শনীয় স্থান। যদি ভাবছেন ইলিশের দেশ রূপসী চাঁদপুরে ভ্রমণ করবেন তবে আপনার চাঁদপুর ভ্রমণ তালিকায় রাখতে ভুলবেন না রক্তধারা স্মৃতিসৌধ। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এই সৌধটি আজো একাত্তরের বিভীষিকাময় স্মৃতিকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে।

পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মিলনস্থল চাঁদপুর বড় স্টেশনের মোলহেডে বধ্যভূমিতে অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ’রক্তধারা’। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্মের দাবিতে প্রশাসনের উদ্যোগে ২০১১ সালে নির্মিত হয় ‘রক্তধারা’। একাত্তরে মুক্তিকামী বাঙালিকে এখানে এনে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হতো। সে জন্যই এ বধ্যভূমিতে একটি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়, যার নাম রাখা হয় রক্তধারা। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে চাঁদপুর শহরের পশ্চিম প্রান্তে মেঘনা-ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় পুরাণ বাজার এবং বড় স্টেশনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কয়েকটি নির্যাতন কেন্দ্র স্থাপন করে। যাকে পাকিস্তানিরা বলতো ‘টর্চার সেল’।নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার ও রেলগাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহনে যারা চাঁদপুরে পৌঁছতো, সন্দেহ হলে তাদেরকে আটকে রেখে এখানে নির্যাতন করা হতো। এছাড়া জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে স্বাধীনতাকামী নারী-পুরুষদের এ টর্চার সেলে এনে অমানবিক নির্যাতন করা হতো। শেষে হাত-পা বেঁধে জীবন্ত, অর্ধমৃত বা হত্যা করে মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর খরস্রোতে ফেলে দিতো।

ধারণা করা হয়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে আনা প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষকে এখানে হত্যা করে মেঘনা নদী মোহনায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। চাঁদপুরের ডাকাতিয়া ও মেঘনা নদীর মিলনস্থলে ঘূর্ণির গভীরতা প্রায় নয়শত ফুট। পাথর বেঁধে মৃত দেহগুলো ফেলে দিলে তা মুহূর্তেই ২০-২৫ মাইল দূরে চলে যায়। মানুষের রক্তস্রোতে মেঘনা-ডাকাতিয়ার স্রোতে মিলিত হয়ে এখানে রক্তের বন্যা বয়ে যেত। সে সময় হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামস এ হত্যাযজ্ঞে সহযোগিতা করতো। এই স্মৃতিসৌধটি একাত্তরের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দুঃসহ স্মৃতি বহন করছে। বর্তমান প্রজন্মের জন্য এটি একটি আলোকবর্তিকা। তাদের এই আত্মত্যাগকে চির অম্লান রাখতেই নির্মাণ করা হয়ে হয়েছে এই স্মৃতিস্তম্ভটি।

রক্তধারা’র স্থপতি চঞ্চল কর্মকার। একটি স্তম্ভে তিনটি রক্তের ফোঁটার প্রতিকৃতি দিয়ে বোঝানো হয়েছে রক্তের ধারা। টেরাকোটার মুর্যা লে আঁকা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ সহ, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলীর চিত্র। অসাধারণ এই ভাস্কর্যটি দেখতে সারা দেশ থেকে অনেক পর্যটক ছুটে আসেন।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে লঞ্চে বা বাসে করে চাঁদপুর যেতে পারেন। লঞ্চঘাট থেকে এই স্মৃতিস্তম্ভের দূরত্ব মাত্র ৭৫০ মিটার। চাইলে হেঁটেই যেতে পারবেন রাস্তাটুকু। এছাড়া রিকশা বা অটোরিকশাতে করেও যেতে পারেন। ঘাট থেকে ভাড়া নেবে জন প্রতি ১০ টাকা। এছাড়া চাঁদপুর জেলার প্রাণকেন্দ্র শপথ চত্বর মোড় থেকেও রিক্সা, অটোরিকশা নিয়েও যাওয়া যায়। আর বাস স্ট্যান্ড থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২ কিমি।

ছবি – ইন্টারনেট 

কন্ট্রিবিউটর – রুবাইদা আক্তার

Facebook Comments
রক্তধারা : মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্মৃতসৌধ